ঈশ্বর সত্য হ্যয়
ঘুটঘুটে অন্ধকার কি ভয়ংকর পরিস্থিতি। নিজের ভরসায় ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়ল মেয়েগুলো সুরঙ্গর মধ্যে সাথে মিনাও ছিল ।তক্ষুনি মাথার উপর বুটের গম্ভীর শব্দ।কান ঝালাপালা করে দিল।কারা এরা?
-- নিচু গলায় কানে কানে কেউ জেন বলল,পুলিশ! নিশ্বাসের শব্দটাও শুনে ফেলতে পারে! সাবধান!
উপরে মেঝে আর নিচে ছাদের অংশ পুরো মাথায় ঠেকে। আসলে এতটা আঁটোসাটো গুপ্ত ছোট্ট সুড়ঙ্গ টা এমন করে তৈরি করা সুরক্ষার জন্য।পুলিশ আসলে মেয়েরা লুকিয়ে পরে কিন্তু কেনো?
অনুমান করলে বোঝা যায় না সব পরিস্থিতিটা কতটা বিপদজনক।
পুলিশ জানতে চায়-
-- ঠিক করে বলুন কোথায় মেয়েরা।নিস্তার নেই আমার হাত থেকে! জেলদি বোল! হ্যম ফির আয়েঙ্গে!আমি আবার আসবো! পুলিশ আধা বাংলায় আধা হিন্দিতে ইচ্ছে করে বলে চলেছেন সে বেশ বোঝাই যাচ্ছে।
জুতোর শব্দ মিলিয়ে গেল মাথার উপর থেকে আস্তে আস্তে। মেয়েগুলোর হৃদপিন্ডের ধুকপুকানিটা একটু গতি পেল যেন।কেউ বলল
- ওরা চলে গেছে!
- চল নিকাল!
-------------------
মিনতি পঞ্চাননতলা গ্রামের সাধারণ ভাটিয়ালি গানের শিল্পী। মাঝেমধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠানে কিম্বা যাত্রাপালায় গান গেয়ে কিছু সামান্য অর্থ উপার্জন করে বাবার হাতে তুলে দেয় অভাবের সংসারে।বাবা চাষি মানুষ।দিনান্তে অন্ন জোগাড় করা তাদের জীবনে কঠিন ছিল।কখনো তাও জুটছিল না।তবে মেয়ের গানের গলা শুনে অনেকেই টাকা দিয়ে নিয়ে যেতে চাইতো পালায় গান করাতে।
বাবা দোটানায় থাকেন মেয়ে মানুষ যেতে দেবে কি না এই ভেবে!
একদিন অনুরোধ আসে পাঁচ হাজার টাকায় গানের আসরে গাইবার জন্য। তখন মা অসুস্থ টাকা নেই ঘরে চাল নেই সেদিন খুশিতে যেতে দেয় বাবা।
" যে জন প্রেমের ভাব জানে না,,তার সাথে নয় লেনাদেনা
খাটি সোনা ছাড়িয়া যে চায় নকল সোনা সেজন সোনা চেনে না!!
দ্বিতীয় গান-
ভ্রমর কইয়ো গিয়া,,, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে, আমার অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে,,,ভ্রমর কইয়ো গিয়ে।
তৃতীয় গানের অনুরোধ আসে-
" গোপালকে দড়ি বেঁধে রাখিস নে,,, ছেড়ে দে মা জননী।
এই মধুর ভাষার গান হৃদয় আন্দোলিত করে।
শ্রোতাদের মধ্যে কিছু ছেলেরদল অনুরোধ করে অন্য গান গাইতে পরিস্থিতি সামাল দিতে গান ধরে লতাজির ---
"রেয়না বীত যায়,,,, শ্যামনা আয়ে।নিন্দিয়ানা আয়ে,,, নিন্দিয়ানা আ,,য়ে।"
মুগ্ধ শ্রোতা অবাক হয়ে যায় হিন্দি গানটা মিনতির গলায় বেশ মানায়।
শেষের গান টি শিবচতুর্দশী উপলক্ষে গাইল
" ঈশ্বর সত্য হ্যয়, সত্য হি শিব হ্যয়!,, শিব হি সুন্দর হ্যয়
জাগো উঠকর,,,,,
-সত্তম শিবম সুন্দরম"!
অপূর্ব! অপূর্ব। ক্লাব কর্তিপক্ষ প্রচুর উপহারের সাথে চাল ডাল তেল,রেশন উপহারে টাকাও গোবিন্দের কৃপায় পায়। মিনতি মায়ের ওষুধের টাকা জোগারো হয়।
-- বাবা আমি পালার দল গড়বো গান গেয়ে রোজকার করবো দেখে নিয়ো!
একদিন-------
-- গ্রামের এক মোড়ল কাকা উপস্থিত হন মিনুতির বাড়িতে।তিনি এসে বলেন-
-- বলি মেয়ে তোমার সাক্ষাৎ সরস্বতী যে? কি গা! মেয়েরে বসিয়ে রাখবে? ওর অত প্রতিভা আছে যখন তখন ওরে দাও কলকাতা নিয়ে যাই।দেখবা-এককমাসের মধ্যে তোমার অভাব সব দূর হই যাবে!
বাবা ভয় পান দূর দেশে ছাড়তে মেয়েও যেতে রাজি হয়না।
মিনতিকে অনেক কাকুরা। "আমারে ধৈর্য ধরতি বলেছে"
মিনতির অনিচ্ছা স্বত্বেও তৈরি হলো বাপমায়ের জন্যে
-------------
কলকাতায় এসে মিনতি অবাক নয়নে শুধু ভাবে।এই কালো পড়াশুনা না জানা মেয়েকে কে শিল্পী বলে মানবে?
গ্রামের কাকুকে এই কথা বলাতেই সাংঘাতিক রেগে যান তিনি।তার নাম যিতেন কাকু।
কলকাতার এক অজানা গলির একঘরে বন্ধি করে রাখেন সারাদিন।
দ্বিতীয় দিন নিয়ে গিয়ে আর এক যায়গায় রাখেন।সেখানে প্রচুর মেয়ে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় মিনতি।" এরা সবাই কি শিল্পী?
কথা বলার ধরণ গ্রাম্য ধরণের নয়।সাজগোছ একদম টিভির মেয়েদের মত তাই এগিয়ে আলাপ করার সাহস পেলো না সে।।
বাবা মায়ের চিন্তায় অজানা ভয়ে---
-- মিনতির জন্য প্লেনের ভাড়া দেবে বলেছে।
মিনতি অবাক হয়ে যায়।ভাবে- আমি তো তেমন কেউ নই তবে কেন এতো খরচা করবেন শুনি?
-------------------
-- ট্রেনেতেই বেড়িয়ে গেল ওরা মুম্বাই। তিন দিনের দিন হঠাৎ যিতেন কাকুর মধ্যে পরিবর্তন দেখল মিনতি। কাকুর কাছে ফোন চাইলে একদম না করে দিল।এমন ধমক দিলেন যাতে আর সাহস হয় না চাইবার।
মুম্বাইয়ে মিনুতি কে পরিচয় করানো হয় এক হিন্দুস্থানি মানুষের সাথে। মিনা নাম দিলেন তিনি।এই নাম চলবে বললেব।বলা হল "আজ প্র্যক্টিস কাল গান" বলে চলে গেলেন।
যিতেন কাকু সেই যে গেলেন আর সারাদিনে রাতেও এলেন না।
----------------
মিনুকে চুল কাটিয়ে মুখে রঙচঙ মাখিয়ে অন্যরকম করে দিল ওখানকার মেয়ে বউরা।এমন ভাষা পুরো বোঝাই যায় না।দুটো পোশাক দেওয়া হলো তাকে।
শুধু চোখে চোখে সবার ইশারায় কথা মেয়েদের!
একটা ছোট্ট ঘর বাথরুম টিমটিমে আলোতে সামান্য কিছু খাওয়া দেওয়া এই পরিস্থিতিতে বন্দি করা হল।
দ্বিতীয় দিন প্রথমে একটা হল ঘরে এনে মাইকের সামনে দাঁড়াতে বলল মিনুকে। মিউজিক চলল----
ভয়ে কাঁপতে থাকে কি করবে কি গাইবে সে। গলা শুঁকিয়ে যাচ্ছে।"শহরের এ কোন জাতীয় অনুষ্ঠান?"
সবাই মদ গিলছে! বাজে বাজে পোশাকে মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে।ঢলাঢলির শেষ নেই।বিশ্রী সব ইঙ্গিত।
গাইতে পারছে না কাঁদতে পারছে।
-- রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হিন্দুস্থানি কাকুটা মিনুকে ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রচুর ধমক দিলেন।
এই জগৎ টা গানের জগৎ এর নাম করে আসলে এক লোভের ধ্বংসের পথ।যেখানে মেরে ফেলে মেয়েদের সামাজিক স্বত্ত্বাকে
মিনু মনে মনে স্থির করে ও গান গাইবে। সাথে রাস্তাও বার করবে কি ভাবে সে পালাবে।এছাড়া আর কোনো পথ নেই বাঁচার।
-- এক ম্যহেমান এসে প্রচুর টাকা দিয়ে মালা সাজিয়ে পড়িয়ে দেয় মিনুকে বলেন-
এক রাত কে লিয়ে তুম মেরে হো যাও!ফির জিন্দেগী ভর মেরাহি রেহে না!"
এই সুযোগ ছাড়া যাবে না ভেবে।তার নম্বর নিয়ে রাখে।
------------------
এক সপ্তাহ যেতে না যেতে পুলিশের সার্চিং শুরু হয়ে সমস্ত " মদেরবার " গুলোতে।
ক্রমে আলাপ হয়,বিন্দু,পরী,ঝিমলি,পূজা,রেশ্মি,
সবার আধা বাংলায় বোঝা হয়ে গেল এই মেয়েদের সমাজে আর স্থান হবে না।
ঈশ্বরের স্মরণ নিয়ে বুদ্ধি করতে থাকে সে।
সেই ভয় আজো তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে।
-- --------
এখন সে স্বাধীন। রেগে যায় মিনুতি!একদিন যে গান প্রাণ খুলে গাইত।সেই মেয়ে গান আর গাইতে চায় না। পুরানো স্মৃতি মরে যেতে বলে ওকে।
এখন শুধু ভাটিয়ালি গান আর পালা কীর্তনে নিজেকে সমৃদ্ধ করে রেখেছে
বয়সের ছাপ মনের ছাপকে অনেক অংশে বুড়ো করে দিয়েছে। জীবন মেরে ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু বুদ্ধি করে সে সেই নরক থেকে বেড়িয়ে আসতে পেরেছিল। আজ সমাজে আছে মাথা উঁচু করে চলতে পারে কারণ সবাই ওর পাশে ছিল।
মেয়েদের নিয়ে পালার দল গড়েছে।জেলায় জেলায় হরি নাম বিলায়।বিয়ে সে করেনি।
মিনতির বাবা মা মেয়ের জন্য লজ্জা পায়না বরঞ্চ গর্বিত হয়।
----
গল্পটা বলতে গিয়ে বলে ছিল--
সেদিন যা ঘটেছিল তা ভোলার নয়।
রাতের প্রোগ্রামটার শেষে ইচ্ছে করে কাস্টমারের সাথে দেখা করতে চায় মিনু।নম্রভদ্র মিনুর স্বভাবে একজন ফিদা ছিলেন বারের।তিনি হোটেলের মালিক কে বলে কয়ে টাকা খাইয়ে বেড় করে আনে মিনু কে।
আর সেই সুযোগে বুদ্ধিমান মিনু মা বাবার কাছে তার মোবাইল থেকে ফোন করে সব ঘটনা বলে দেয়।আর পুলিশের সাহায্য চাইতে বলে।গ্রামের মানুষ দুদিনের মধ্যে
সেই কাকার পরিবার সমেত খুঁজে বেড় করে ফেলে। পুলিশ পাঠায় মুম্বাইয়ে।
আজ তার মুখের গানে হাজার হৃদয়কে কাঁদায়। ব্যাকুল অন্তরে কৃষ্ণের চরণে মন!
" লতাজির এই গানের কলি-"ঈশ্বর সত্য হয়" সত্যি প্রভু মঙ্গলময় আমাদের পাশে থাকেন যদি অন্তর থেকে তাঁকে ডাকা যায়!
