প্রতিশোধ
ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে । কাঁচকলের পাশ দিয়ে ব্রিজের নিচের এই রাস্তাটা । একটু রাত হয়ে গেলে আজও ভীষণ নিঝুম । হাড় কঙ্কাল বের হওয়া কাঁচের কারখানাটি এক ধারে মড়ার মত পড়ে আছে । কারখানাটি এককালে ছিল বলেই এ তল্লাটের নাম কাঁচকল । বহুদিন যাবত কারখানার পাশের এই রাস্তায় কোনো মেরামতি হয়নি । তাই এবড়ো খেবড়ো ইঁট বেরিয়ে যাওয়া গর্তে ভরা ।
বেশ কিছুটা আগে থেকেই চলন্ত বাইকটা যেন কেউ টেনে ধরছে ! এমনিতেই এই রাস্তা দিয়ে জোরে বাইক চালিয়ে যাওয়া যায় না । তার ওপর আজ অদ্ভুত কাণ্ড ঘটছে ! কিছুতেই দু মিনিট একভাবে চালিয়ে যেতে পারছে না । অথচ পিছনে কাউকে দেখতেও পাচ্ছে না । আজ শনিবার বলে পার্টি সেরে ফিরতে একটু বেশিই রাত হয়ে গেল । এখন রাত প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে । মোবাইল ফোনটা চার্জ শেষ হয়ে গিয়ে অনেকক্ষণ হল বন্ধ হয়ে গেছে । ঘড়ি পরার শখ নেই, তাই আন্দাজেই সময় নির্ধারণ করতে হচ্ছে । শান্তনুকে এবার এক অজানা ভয় পেয়ে বসল । বাইকটা রাস্তার একধারে দাঁড় করালো । মাথায় রুমাল চাপা দিয়ে উবু হয়ে বসে বাইকের কিছু হয়েছে কিনা বোঝার চেষ্টা করছিল । রাস্তাটার কোনো জায়গায় একটুও আলো নেই । শুধুমাত্র তার বাইকে ব্যাটারি চালিত হেডলাইটটা এখনও জ্বলছে । কার্বোরেটরে হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করল । কিছু হয়েছে কিনা ! হঠাৎ টের পেলো ওর পিঠে কে যেন হাত রেখেছে, এরকমই স্পর্শ যেন । হাতটা খুব ছোট আর নরম প্রকৃতির । মেয়েলি হাতের মতই । চমকে উঠল সে । এত রাতে এখানে কে তার পিঠে হাত দিতে আসবে ? ঘাড় ঘুরিয়ে সেটাই দেখার চেষ্টা করল । নাহ্ ! কেউ নেই তো...। পিছনে তাকিয়ে দেখল নিকষ কালো অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই । তাহলে মনের ভুলই হবে । গাড়িটাকে স্টার্ট দিয়ে উঠে বসল আবার । দূরে কোথাও একটা কুকুর মড়া কান্না কেঁদে উঠল । ফার্স্ট গিয়ার, সেকেন্ড গিয়ারের পর থার্ড গিয়ার দেওয়ার সাথে সাথেই বাইকটাকে কে যেন তীব্র গতিতে সামনের দিকে ঠেলে দিল । শান্তনু টাল সামলাতে পারলো না । সোজা বাঁ দিকের দেওয়ালে গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারতেই ওর শরীরটা ছিটকে গিয়ে পিছনে যেন উড়ে গেল । শান্তনুর মাথাটাও গিয়ে দেওয়ালে দড়াম করে সশব্দে ধাক্কা মারল । মুহূর্তের মধ্যে হেলমেট হীন মাথাটা ব্রহ্মতালুর ওপর থেকে ফেটে চৌচির । গলগল করে ফিনকি দিয়ে রক্ত... কয়েক মিনিটের মধ্যে সব শেষ ।
ঝিমলিকে রোজ রাতে ওর বাবা রঞ্জন মান্না সাইকেলের কেরিয়ারে চাপিয়ে নিয়ে যায় । শনিবার ওর তিনটে সাবজেক্টের প্রাইভেট পড়া থাকে । এগারো ক্লাসে সবে উঠেছে । স্কুল থেকে বেরিয়ে একটা । ছটায় একটা । তারপরে শেষেরটা সাড়ে সাতটায় । নটার আগেই ওর বাবা ওকে নিতে পৌঁছে যেত । রঞ্জন মান্না স্থানীয় এক প্রোমোটারের কাছে কাজ করেন । সকাল দশটা থেকে শুরু । কাজ শেষ করে ফিরতে রাত নটা-দশটা বেজে যায় । মেয়ের পড়ার দিনগুলোতে আগে বেরিয়ে যাবেন এটা বলাই আছে । রাত সাড়ে আটটার মধ্যে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন ।
সেদিন দুপুর থেকেই আকাশটা মেঘলা ছিল । সন্ধ্যে থেকে মাঝেমাঝেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি আসছিল । মেয়েটা ছাতা নিতেও ভুলে গেছে । রাত বিরেতে এই পড়া থেকে ফেরা নিয়ে বাপের মনে ভীষণ চিন্তা হয় ।
প্রোমোটার সৌমেন মজুমদার নতুন একটা প্রজেক্টে হাত দিয়েছেন । সেটায় পার্টনারশিপে শান্তনু নামের যে ছেলেটিকে নিয়েছেন, তাকে রঞ্জনের একেবারে পছন্দ নয় । ছেলেটা ভীষণ উগ্র প্রকৃতির । লোফার মার্কা চালচলন । একদিন রাস্তায় মেয়ের সাথে রঞ্জনকে দেখেছিল । সেদিন ঝিমলির প্রতি শান্তনুর দৃষ্টি একদম ভাল লাগে নি । উঠতি পয়সাওয়ালা আজকালকার ছেলে । শিক্ষাদীক্ষার বালাই নেই । রঞ্জনের ভীষণ ভয় করে ।
ঝিমলি ওর বাবাকে কদিন আগেই বলেছিল, কদিন ধরে ওর স্কুলের সামনে বা টিউশন পড়ার রাস্তায় শান্তনু, দুজন বন্ধু সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । ওই ছেলে দুটোও কেমন যেন...!
সেদিনও শনিবার ছিল । ঝিরঝিরে বৃষ্টির সন্ধ্যে ।
সৌমেন মজুমদার সারাদিন অফিসে আসেননি । সন্ধ্যেবেলায় পরপর দুটো পার্টি, ফ্ল্যাটের বুকিং করতে এসেছিল । তাদের ছেড়ে বেরোতে রঞ্জনের প্রায় পৌনে দশটা বেজে গিয়েছিল । খুব জোরে সাইকেল চালিয়ে মেয়ের আন্টির বাড়ি পৌঁছে জানল, অনেকক্ষণ আগেই ঝিমলি বেরিয়ে গেছে । কই রাস্তাতেও তো ওকে দেখতে পায়নি ! তবে কি মেয়ে বাড়ি পৌঁছে গেছে ? না, তাই বা কি করে সম্ভব ! ন'টা পঁয়ত্রিশেও ওর মা ফোন করে মেয়েকে আনার তাড়া তাহলে দেবে কেন ? রঞ্জনের চিন্তা ক্রমশ দুশ্চিন্তায় পরিণত হতে লাগল । কাঁচকলের অন্ধকার রাস্তাটা পেরোনোর সময়ে মনটা কেমন যেন 'কু' গাইল !
ঝিমলি বাড়ি ফেরেনি । সেই রাতটা যে কিভাবে কেটেছিল...! পরদিন সকাল থেকে শুরু হয়েছিল থানা পুলিশ, খোঁজাখুঁজি । নিখোঁজ ডায়েরি পেয়ে পুলিশ সবরকম সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছিল । সন্দেহের তালিকায় শান্তনু আর ওর দুই বন্ধুর নামও উঠেছিল । পুলিশ ডেকেও শেষে ছেড়ে দিয়েছিল । রঞ্জনকে পুলিশ বলেছিল, শুধুমাত্র ঘোরাঘুরি করতে দেখে কাউকে সন্দেহের বশে কিছু প্রমাণ করা যায় না । আসলে শান্তনুর ওপরতলায় কানেকশন প্রচুর । নেতা মন্ত্রী ধরে ওরা পুলিশি হাঙ্গামা স্বছন্দে এড়িয়ে গেল । এদিকে মেয়েটার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না । জলজ্যান্ত মেয়েটা যেন কোথায় উবে গেল ! ঝিমলির মা ক্রমশ বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হয়ে গেল । রঞ্জন কাজকর্ম ছেড়ে আধ পাগলের মত দিনে তিন চারবার থানায় যায় আর ফিরে আসে । কবে ওদের বাড়িতে শেষ উনুন জ্বলেছিলো কারোর মনে নেই ।
উইকএন্ডে ঝিরঝিরে বৃষ্টির সন্ধ্যেটা ওরা কেউ মাটি করতে চাইল না । মজনু নিজের গাড়ি ভাড়ায় খাটায় । নিজে ড্রাইভারও হয়ে যায় দরকার পড়লে । সেদিন সকাল থেকে একটা ট্রিপ খেটে ভাল রোজগার হয়ে গিয়েছিল । পিনু অনেকদিন ধরেই বলছিল, "ভাই অনেকদিন খাওয়াসনি কিন্তু..." সেজন্যই ফেরার পথে এক লিটারের একটা বোতল, মজনু কিনে নিয়ে ছিল । শান্তনুকেও ফোন করে ডেকে নিয়েছিল । কাঁচকলের অন্ধকার রাস্তার ধারে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে রেখেছিল । শান্তনু বলল তার আসতে একটু দেরি হবে । তাই মজনু আর পিনু দুজনে মিলে গলায় ঢালা শুরু করে দিয়েছিল । শুধু মুখে অপেক্ষা করা যায় নাকি ? শান্তনু আসার আগেই ওদের বেশ নেশা জমতে শুরু করে । শান্তনু বাইকে এসে ওদের সাথে যোগ দেয় । তিনজনের মৌতাত তখন চরমে । শান্তনু ওই অন্ধকার রাস্তায় হাল্কা আলোর আভায় লক্ষ্য করল দূর থেকে হেঁটে আসছে তার জানেমন ঝিমলি সোনা । শান্তনুর মনে হল, নেশাতুর চোখে সে বুঝি স্বপ্ন দেখছে । আরো একটু কাছে আসতে তিনজনেই ঝিমলিকে যখন দেখতে পেলো তখন ওদের ধন্দ কাটল । কি আশ্চর্য্য ! এ যে মেঘ না চাইতেই জল ! শান্তনু রাস্তার ওপরে টলতে টলতে গিয়ে ঝিমলির পথ আটকে দাঁড়ায় । ও একা নয় । ওরা দুজনও ঘিরে ধরে ষোড়শী ঝিমলিকে । কি করবে, ভেবে পায় না অতটুকু একটি মেয়ে । বুঝতে পারে বাবার জন্য অপেক্ষা না করে একা বাড়ি ফেরাটা একেবারেই অনুচিত কাজ হয়েছে । কিন্তু এখন কি করবে ও ? ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছিল । মুহূর্তের মধ্যে ওর বিহ্বলতার সুযোগ নিয়ে ওরা পাঁজাকোলা করে ওকে তুলে এনে গাড়িটার মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলল । মুখে কারোর একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরা । গাড়ির মধ্যে এনে একটা কাপড়ের টুকরো দিয়ে ওর মুখটা কে যেন বেঁধে দিল । ঝিমলির মুখ দিয়ে শুধু গোঙানির শব্দ শোনা যাচ্ছিল । ওর বইয়ের ব্যাগটা কেউ সরিয়ে নিল । অন্ধকারের মধ্যেও ও তিন শ্বাপদকে চিনতে পেরেছে । গাড়িটা অন্ধকার পথে চলতে শুরু করল । ঝিমলিকে দুজনে জাপটে ধরে রেখেছে । একটুও নড়াচড়া অসম্ভব । কেউ একজন বলল, "কাঁচকলের পিছনের দিকটা সেফ হবে । ওদিকে নিয়ে চল ।" তারপর তিন মদ্যপ মিলে গাড়ির মধ্যে... গাড়ি থেকে নামিয়ে মাটিতে ফেলে... উপর্যুপরি । একের পর এক । ঝিমলির ফর্সা শরীরটা যন্ত্রণায় নীল হয়ে যেতে লাগল । কখন যে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, ওরা তিনজন নেশার ঘোরে বুঝতেই পারেনি । পিনুই প্রথমে ঝিমলির নাকের কাছে হাতটা নিয়ে গেল । তারপর কি মনে করে জড়ানো গলায় বলল, "এহ্ ! এ যে শালা খালাস হয়ে গেছে রে... খুব রিস্ক হয়ে গেল মাইরি ।" মজনু শুনে ভয় পেয়ে বলে উঠল, "এবার কি করবি ? শান্তনুদা, এই মাইরি কিছু একটা বুদ্ধি লাগাও । নাহলে ধরা পড়ে যাব যে.." শান্তনুর মাথায় হঠাৎ দুর্বুদ্ধি খেলে গেল ! শয়তান ভর করল বোধহয় । মজনুকে বলল, "তোর গাড়িতে রিজার্ভ পেট্রোল নেই ?" মজনু বলল, হ্যাঁ । শান্তনুর ইশারায় মজনু গাড়ির ভেতর থেকে দু লিটারের জ্যারিকেন ভর্তি পেট্রোল নিয়ে এলো । কাঁচকলের পিছন দিকের এই আগাছার জঙ্গলে ভরা জায়গাটায় দিনের আলোতেও কোনো ভদ্রলোক ধার মাড়ায় না । এই রাত বিরেতে তো কথাই নেই । পাঁচিল ঘেঁষে ঝোপের মধ্যে ঝিমলির অচৈতন্য শরীরটাকে ধরাধরি করে এনে ফেলে দিল । তারপর দু লিটার পেট্রোল পুরোটাই তার শরীরের ওপরে ছড়িয়ে... একটা দেশলাই কাঠির আগুনই তার শরীরের জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠল ।
পুলিশ হতভম্ব । একই রাতে প্রায় একই সময়ে । রাত সাড়ে বারোটা থেকে দেড়টার মধ্যে...। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে তিন বন্ধুর এক সঙ্গে মৃত্যু ! পিনু নিজের বাড়িরই দোতলার ছাদ থেকে সটান রাস্তায় পড়ে গিয়ে স্পট ডেড । মজনু, বন্ধুদের সঙ্গে মদ খেয়ে বেহুঁশ অবস্থায় বাড়ি ফিরছিল । রেল লাইনের পাশের রাস্তাটা দিয়ে ওর শর্টকার্ট হয় । সকালবেলা রেললাইনের ওপরে তার ছিন্নভিন্ন দেহ মিলেছে । রেল পুলিশ লাশ দেখে বুঝেছিল, রাতের কোনো মেল ট্রেনের ধাক্কায় মজনুর এরকম অস্বাভিক মৃত্যু ।
আর শান্তনু, তার নিজেরই বাইকে ফাঁকা রাস্তায় দুর্ঘটনায় মৃত্যু !
_______________________
