লেবু লজেন্স
লেবু লজেন্স
কলেজ জীবনে তখন আমি নবাগতা আর সে ছিল আমার থেকে দু বছরের প্রবীণ।প্রথম কদিন চোখে চোখে দেখা তারপর নবীনবরণের দিন আমি তার কবিতা বলার ভঙ্গি আর কন্ঠের জাদুতে মোহাচ্ছন্ন হলাম ।অবশ্য এই মোহ বোধহয় উভয় দিক থেকেই ছিল।তাইতো সেদিন অনুষ্ঠানের পর আমার গানের প্রশংসার সময় তার আবেগ আর চোখের মুগ্ধতায় আমারও মন ভরলো।আমাদের দুতরফ থেকেই ভালোলাগার পরশে দুজনের মন ভিজলেও কিন্তু সেদিন আমরা কেউ কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই আদিকাল থেকে প্রবাহমান অনন্ত ঐতিহ্যময় চার অক্ষরের শব্দটা বলে উঠতে পারি নি।আমরা দুজনেই এ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম বলেই হয়তো আমাদের অনুচ্চারিত ভালোলাগাকে আর বেশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় নি।শুধু একটু চোখাচোখি বা কলেজ ছুটির পর চায়ের দোকানে দুজনে একসাথে এককাপ চা খাওয়ার থেকে বেশি আমাদের সম্পর্ক এগোয় নি। চায়ের পর একটা লেবু লজেন্স খাওয়া ছিল আমার প্রিয় অভ্যাস ,সে যখন আমার সাথে চায়ের দোকান পর্যন্ত এসে চায়ে চুমুক দিত আমিও তার হাতে একটা লজেন্স তুলে দিতাম।আমার সাথে সেও এই অভ্যাসটাকে তার প্রিয় করে ফেলেছিল।তার কলেজ শেষের পর বিদায় সম্বর্ধনার দিন আমাদের শেষ দেখা হয়েছিল। দুজনের মনে ভালোলাগার রেশ রেখে মনে কোন মালিন্যের পরশ না লাগিয়ে আমাদের সেই সম্পর্কের ইতি ঘটেছিল।
আমি আমার সাংসারিক জীবনে নতুন মানুষের সাথে অনেক স্বপ্ন নিয়ে জীবন শুরু করেছিলাম।আমার কিছু স্বপ্ন সফল আর কিছু স্বপ্ন অধরা রেখে আজ বিয়ের চল্লিশ বছর পর আমি একজন সফল গৃহবধূ আর গর্বিত মা। আমার আংশিক নৈপুণ্য আর অবশিষ্ট খামতিতে ভরা সংসারে আমিই আমার পরিবারের সর্বেসর্বা। ভোরের পাখির ডাকের সাথে সকালে আমার হাতের চা ছাড়া আমার স্বামীর যেমন দিন শুরু হয় না তেমনি দিনের অবসানে সন্ধ্যেবেলা আমার তৈরি চা বিনে আমার প্রিয় মানুষটির দিন শেষ হতে চায় না।আমার স্বামীর কথায় আমার হাতের জাদুতে নাকি চা অমৃতের স্বাদ পায়।
আমরা দুজন জীবন সীমান্তে উপস্থিত দুটি মানুষ ,আমাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনের সুখ-দুঃখ আমাদের দুজনকে ঘিরেই দানা বাঁধে। আমাদের সন্তানেরা স্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত আর ভিনদেশে কর্মব্যস্ত। মাঝে মাঝে তারা পরিযায়ী পাখির মতো এসে আমাদের একঘেয়ে জীবনে বৈচিত্র্য আনে।আমার স্বামী শান্ত স্বভাবের হলেও আমি বাকপ্রিয়।আত্মীয় ,বন্ধুর আগমনে আমাদের একা থাকার হতাশা কিছুটা হ্রাস পায়।আমাদের সাংসারিক একঘেয়েমিতে কিছুটা বৈচিত্র্যের ছোঁয়া লাগে।আমার স্বামী তাই মাঝে মাঝেই তার বন্ধু-বান্ধবদের চায়ের নিমন্ত্রণ জানান। আজও বিকেলে আমার স্বামীর নিমন্ত্রণে তার কয়েকজন বন্ধু সান্ধ্যকালীন চায়ের আড্ডায় আমার হাতের চা খেতে এসেছেন।বাড়িতে অতিথির আগমনে অন্যান্য দিনের মতো আমিও খুশি মনে চা বানাচ্ছি ,এমন সময় রান্না ঘরে --আজও চায়ের পরে লেবু লজেন্স মিলবে তো ?
বিয়াল্লিশ বছর পরে সেদিনের লম্বা ছিপছিপে চেহারায় ভারিক্কি আর মেদের ছোঁয়া সত্ত্বেও আজও আমি তার গম্ভীর গলাটা শুনে চমকে উঠে সেদিনের মতোই লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলাম।
