বইয়ের বিবরণে ফিরে যান প্রতিবেদন পর্যালোচনা

যদি এমন হত

বিভাগ গল্প                                                                       #যদি এমন হতো                                                                     #কলমে  সারদা                                                    সদাহাস‍্যময়ী দোলা কিন্তু বড্ড ভুলো মনের মেয়ে।শ্বশুর,শাশুড়ি, কর্মব‍্যস্ত স্বামী  আর কিশোর  পুত্র নিয়ে তার  ছোট্ট সংসার।রূপে,গুণে অতি সাধারণ দোলা তার  যাবতীয়  খামতি পূরণ করার চেষ্টা  করে তার  সেবা ও ভালোবাসা  দিয়ে।তবে তার  সে গুণেও বাঁধ সেধেছে তার  ভুলো মন।কোনো কাজই  সঠিক  সময়ে সঠিক  ভাবে হয়ে ওঠে না।আর তাই তো ছোটো ছোটো তিরস্কার  আর গঞ্জনা তার নিত‍্য সঙ্গী। দোলার  স্বামী  অবশ‍্য তেমন নজর করেন না।আসলে তিনি  ‍ব‍্যস্ত মানুষ।সংসারের ছোট খাটো বিষয়ে  তাঁর তেমন  নজর নেই।তবে ইদানীং  তিনিও  স্ত্রীর  আচরণে ব‍্যঙ্গ বিদ্রূপ  করতে ছাড়েন না।আজকাল বাবার সঙ্গে যোগ দেয় তাদের সেভেনে পড়া ছেলে রনিও। দোলার তার নিজের  কথা ভেবে মাঝে মাঝে খুব  মন খারাপ  করে।নিস্তব্ধ রাত্রিগুলোতে খোলা জানালা দিয়ে উন্মুক্ত  আকাশ দেখতে দেখতে  দোলা  কেমন যেন উদাস হয়ে  যায়। আজ আবার  ভুল হয়ে গেছে  কাজে।ছেলেকে টিফিন  দিতে  ভুলে  গেছে সে।স্বামী অর্কই অবশ‍্য সম‍স‍্যার সমাধান  করে দিয়েছে। অফিস যাবার পথে ছেলের স্কুল গেটে  নামিয়ে দিয়েছে তাকে।কতদিন বাদে একসাথে গাড়িতে স্বামীর সঙ্গে কোথায়ও বেড়ানো।বেশ লাগছিল  দোলার।আলমারি খুলে একটা  ভালো শাড়িও  বার করতে চাইছিল সে।কিন্তু অর্ক সে সময় দিতে  নারাজ।অগত‍্যা আলনায় ঝোলানো সিন্থেটিকটাই পড়ে নিয়েছে দোলা।আসবার সময় বাজারের থলিটাও নিয়ে  নিয়েছে। টিফিন দেওয়ার পর্ব শেষ করে সবজি বাজারের দরাদরি করতে ব‍্যস্ত দোলা।হঠাৎ এক নরম হাত পিছন থেকে  জড়িয়ে  ধরে তাকে।আরে!এতো স্কুলবেলার বান্ধবী  মধুজা।তোর গলার আওয়াজ তো সেই স্কুল বেলার মতোই মিষ্টি  আছে রে কলকলিয়ে বলে ওঠে মধুজা।দোলার টোলপড়া গালটা টিপে দেয়। এতো বছর বাদে মধুজা কে দেখে দোলা খুশী হওয়ার পরিবর্তে কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। সুন্দরী ,সুবাসিত সবুজ  সালোয়ার  পরিহিতা মধুজাকে দেখতে দোলার চেয়ে  প্রায় দশ বছরের ছোট মনে হচ্ছে । মধুজার জোড়াজুড়িতেই সামনের এক কফিশপে ঢুকে  পড়ে তারা। বাজারের থলিটা পায়ের কাছে লুকিয়ে  রাখে দোলা।গল্পে গল্পে ঘড়ির কাঁটা  দ্রুত  এগিয়ে  চলে।হঠাৎ দোলার বুক ধুকপুক  করে ওঠে।আজও হয়তো বাড়ি ফিরে তার কপালে  দুঃখ  আছে।তাড়াতাড়ি কফিশপ থেকে বেরিয়ে  একটা  টোটোয় উঠে পড়ে।।যাবার আগে মধুজা তাকে জড়িয়ে  ধরে বলে সারাজীবন  এভাবে  ভয়ে ভয়ে থেকে  নিজেকে একেবারে শেষ করে দিস না।এবার অন্তত  একটু 'না' বলতে শেখ।কথা গুলো যেন দোলার মর্মে প্রবেশ করে।টোটোতে বসে দোলার চোখগুলো কেমন জ্বালা জ্বালা করতে থাকে। বাড়ি ফিরে বাজারের থলিটা যেই রাখতে যাবে অমনি শ্বশুরমশাই বিদ্রূপ  করে বলে ওঠেন  কিরে আজকে কি বাড়ির পথ ভুলে  গিয়েছিলি নাকি। এতো দেরী  করলি যে। আমরাও কি আজ খোকার মতো শুধু মাছের  ঝোল ভাত খেয়ে থাকব নাকি?দোলা আর সহ‍্য করতে পারে না।ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে আমি আজ আর কোনো রান্না  করতে পারব না।বৌমার উচ্চ কন্ঠস্বরে বৃদ্ধ  কেমন হতচকিত হয়ে যান।আজ থেকে  পনেরো বছর আগে এই মেয়েটি তাঁর সংসারে এসেছে।মাঝমাঝে বকাঝকা করলেও এই শান্ত,নিরীহ,ধীরস্থির বৌমাটিকে তিনি  সন্তানের  মতোই ভালোবাসেন। তার এই পরিবর্তনে যেন স্তব্ধ হয়ে যান তিনি।বৈঠকখানার সোফায়  গিয়ে  চুপ করে বসে পড়েন ।যুগের হাওয়া হয়তো সব ঘরেই তার পরিবর্তনের ছাপ রাখবে। দোলা তার নিজের  ব‍্যবহারে নিজেই কেমন অবাক হয়ে যায়।হীনমন‍্যতা আর দীর্ঘদিনের অবহেলা বুঝিবা তার মনের সবুজ ভূমিকেও পাথুরে জমিতে পরিণত করেছে।শাশুড়িমা সব কিছু লক্ষ‍্য করছিলেন।হঠাৎ কাছে এসে  তিনি  দোলাকে বুকে টেনে নেন।ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে  থাকেন।আজ এতো বছর বাদে শাশুড়িমার শাড়ি  আঁচলে কেমন মা মা গন্ধ পায় সে।ডুকরে কেঁদে ওঠে দোলা।শাশুড়িমা বলেন রোদে রোদে ঘুরে  মেয়ের  আমার  মেজাজ  তো আজ সপ্তমে।তুই বস একটু আমি  সরবত করে আনি।শ্বশুরমশাই এর পাশে গিয়ে চুপ করে বসতেই তিনিও  লজ্জায়  অধোবদন পুত্রবধূটির মাথায় পরম স্নেহে হাত রাখেন।দোলার চোখের জল বাঁধ মানে না।সে বেশ বোঝে তার  ত‍্যাগ বৃথা যায় নি।বাইরে থেকে নিস্প্রভ লাগলেও ভালোবাসার  প্রদীপখানি সে সবার অন্তরে জ্বালাতে পেরেছে।আর সেই আলোকে তার জীবনও  আজ আলোকিত।

পর্যালোচনা


আপনার রেটিং

blank-star-rating

বামদিকের মেনু