শোধ
|| ১||
‘কাগজে একখানা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম, তা ধরুন মাস দশেক আগে, মানে ওই হল গিয়ে, 'গতবছরের মার্চে । তারিখটা ছিল ১৬ই মার্চ । আমার কাছে সেদিনের কাগজটা আছে এখনও।এর প্রায় দিন পাঁচেক পর, একদিন বিকেলে আমার সিকিউরিটি গার্ড এসে খবর দিল, ‘বাবু একজনলোক আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন, বলল কী সব বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে।' আমি তখনই আন্দাজ করেছিলাম যে কাগজে বিজ্ঞাপন দেখেই হয়তো কেউ... তো যাই হোক... তারপর চরণ নামের একটি ছেলে আমার সাথে দেখা করল। কথাবার্তা ঠিকঠাক দেখে ওকে পরদিনই কাজে লাগার কথা বললাম। কিন্তু ও... ও বারবার বলছিল কাল নয়, সেদিন থেকেই যেন আমি ওকে কাজে রাখি। কথা শুনে মনে হল, বেচারার কাজের খুব দরকার, তাই রেখে দিই। ব্যস, এভাবেই...। ’
ব্যারিস্টার মুরারি সেন এর বয়ান শুনছিলেন ইন্সপেক্টর মুখার্জি।সেই সকাল থেকে একটানা জেরায় জেরবার মুরারিবাবু। আপাতত তিনি বাঁ হাতটা গদিঅলা চেয়ারের হাতলের উপরে ভর দিয়ে চোখে আঙ্গুল দিয়ে ঝুঁকে আছেন। মিনিট কয়েক পর, ইন্সপেক্টরও প্রশ্নোত্তরের পাট চুকিয়ে উঠে পড়লেন। ‘চলি মুরারিবাবু, দরকারে আবার আসব ', বলতে বলতে চেয়ার ছাড়লেন তিনি।
মুরারিবাবু নিজের দোতলা বসতবাড়ির থেকে প্রায় দশহাত দূরেই চাকরবাকরদের জন্য এই দু'কামরার ঘরটি তৈরী করেছিলেন । একটাতে থাকত ড্রাইভার চরণ, আর আরেকটায় এখনও থাকে পরিচারক হরি।আর ঘরের পেছন দিকটায় বাথরুম আর কলপার ।
চরণের থাকার ঘরটা,আপাতত বাইরে থেকে তালাচাবি দিয়ে রেখেছে পুলিশ।বছর পঁচিশের তরতাজা ছেলেটার এমন অপমৃত্যুতে গোটা বাড়িটা কেমন শুনশান।
মুরারিবাবুকে রাতের খাবার দিয়ে, নিজে একটু মুখে গুঁজে তাড়াতাড়িই নিজের ঘরে এল হরি। শোয়ার আগে হাতমুখ ধুতে কলপারে পা দিল ভয়ে ভয়ে। গা টা যেন কেমন ছমছম করছে ওর। মনে হচ্ছে এই বুঝি চরণও হাত মুখ ধুতে বেরোবে ঘর থেকে। পেছন থেকে বলবে, ‘আজ বেশ ঠান্ডা তাই না হরিদা ?’হাতমুখটা কোনওমতে ধুয়ে ঘরের দিকে ফিরতেই হরি টের পেল, যে ওর পরনের ফতুয়াটায় একটা টান পড়ছে। কেউ একজন টানছে পেছন থেকে । নাহ্, এদৃশ্য দেখার সাহস ওর নেই ।
ক্রমশ তীব্র হচ্ছে সে টান। কয়েক মিনিট অসম লড়াইয়ের পর , দু'হাত এলোপাথারিভাবে শূন্যে ছুঁড়তে ছুঁড়তে, হরি শেষ পর্যন্ত লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। কোনওরকমে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে ঘরের চৌকাঠ ছোঁয় ও। তারপর একনিঃশ্বাসে ছিটকিনিটা তুলে দিয়েই, ‘রাম, রাম, রাম, রাম’ করতে থাকে। হিন্দুমতে মৃত্যুর পর মৃতের ঘরে সর্ষের তেলের প্রদীপ জ্বালানো হয়। আর এ তো যে সে মৃত্যু নয়, একেবারে অপমৃত্যু। কিন্তু বন্ধ ঘরে , ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হরি কোনও প্রদীপ জ্বালাতে পারেনি।তবে অনিয়মের কচকচানির থেকেও কৃতকর্মের ভয়টা বেশি করে চেপেছে ওর ভেতর। কাজটাতো ভালো করেনি ও চরণের সাথে।
একটা লো-পাওয়ারের টিউব লাইটের টিমটিমে আলোয় ঘরটায় সবকিছুই ঘোলাটে মনে হচ্ছে। ঘরের আনাচে কানাচেও জমা হচ্ছে চাপচাপ রহস্যময় অন্ধকার। এ আলোয় নিজের ছায়া দেখলেও বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে, ঠিক যেমন এখন হরির করছে। সে এমন একটি ঘরে এখন রাত কাটাতে যাচ্ছে, যেখানে কয়েকঘন্টা আগেই একটা জলজ্যান্ত মানুষ ঝুলেছিল । ওহ্, কি মর্মান্তিক সেই ছবি ! ভুলতে চেয়েও সকালের সেই ভয়ংকর লাশটাই হরির চোখে বারবার ভেসে আসছে। তবে এবার হয়ত একটু রেহাই মিলবে ওর। কারণ সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটা খাটনির পর, দু'চোখ নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে আসছে এখন । ‘কিন্তু কি হল ? কিসের শব্দ ওটা? একটা শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ আসছে না ! ’, বিছানা থেকে নিচে নামতেই হরি শুনতে পেল চরণের গলা, ‘এঘরে একটা আলো জ্বালাও হরিদা। বড্ড অন্ধকার। ও হরিদা ... শুনতে পাচ্ছনা।’ ফ্যাসফ্যাসে সেই আওয়াজে হরি ধড়াস করে পড়ে গেল বিছানায়।
||২||
চরণের মৃত্যুর পর থেকেই মুরারিবাবুর কাজে কোনও মন নেই। আইনের মোটা মোটা বইয়ে ঠাসা স্টাডিরুমটা কেমন যেন গুমোট লাগে। কোর্টেও যান না বেশ কিছুদিন থেকে।তবে তার পেছনে আরেকটা কারণও আছে, বছর পঞ্চাশের মুরারিবাবু হাতে চোট পাওয়াতে এখন আর ড্রাইভিংয়ের ঝুঁকিটা নিতে চান না।
আজও ভরসন্ধ্যেবেলা টেবিলের কাছে বসে পেপারওয়েটটা নাড়াচাড়া করছেন শুধু। মনে মনে ভাবছেন চরণের কথা।সত্যিই কি তিনি খুব বাড়াবাড়ি করেছিলেন চরণের সাথে ? প্রশ্নটা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে ওঁকে। এমন সময় একটা টেলিফোনে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে, নড়ে উঠলেন মুরারিবাবু। ফোনটা কানে দিতেই শুনলেন ইন্সপেক্টর মুখার্জির গলা, ‘যে ঠিকানা চরণ আপনাদের দিয়েছিল, সেটা ফলস। সেখানে ওই নামে কেউ থাকেনা।’
মুরারিবাবুর মুখের ভাবটি এমন, যেন এরকমই একটা উত্তর তিনি আগে থেকেই জানতেন।
স্টাডিরুমের দুয়ারে এসে, হাঁক দিল হরি। মুরারিবাবু রাতের খাওয়া বারোমাস আটটায় সেরে নেন। সেকথা বলতেই হরি এসেছে। মুরারিবাবু চমকে উঠে বললেন , ‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ , যাচ্ছি, তুই যা।'হরি নড়ল না সেখান থেকে। মনে মনে ঠিক করে এসেছে, দাদাবাবুকে গতরাতের কথা বলবেই। কিন্তু বলতে গিয়েও আটকে গেল, কারণ মুরারিবাবু আবারও একজনের সাথে ফোনে ব্যস্ত।
একটু আগের গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে মুরারিবাবুর মুখে একটা অসম্ভব ঔজ্জ্বল্য ধরা পড়ল এবার। কথা শেষ করে রিসিভারটা রেখেই দাঁড়িয়ে থাকা হরির দিকে চেয়ে বললেন, ‘ওহ তুই যাসনি এখনও, যাকগে ভালোই হল। শোন খোকা কালই ফিরছে দুপুরে। ওর ঘরটা একটু ঝারপোছ করে রাখিস। ’
কাজকর্ম গুটিয়ে হরি যখন নিজের আস্তানার দিকে পা বাড়াল , তখন রাত দশটা।শীতের রাতে এই অনেক। নিঝুম রাতে যেন চরাচরে আর কোনও জনমানব নেই, এতটাই নিখাদ এই নৈঃশব্দ। হরি কিছুদূর এগিয়ে আবার পেছন ফিরে বাড়িটাকে দেখল। মনে হয় একটা ছোট টিলা যেন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
রাত পোহালেই তৃতীয় দিন। আর শুধু একটা দিন ব্যাস। চারদিনের দিন শ্রাদ্ধশান্তি সব মুরারিবাবুই করবেন ঠিক করেছেন। একটু আগেই ঠাকুরমশাইয়ের বাড়ি গিয়ে হরি খবর দিয়ে এসেছে ওনাকে। কাল সকালে গিয়ে ফর্দটা নিয়ে আসবে ও ।
নাহ্ , আজ আর কলপার নয়, ঘরে গিয়েই সটান ছিটকিনি তুলে দিল হরি। আজ আর আলো নেভাবে না। এইভাবেই শোবে। শ্রাদ্ধশান্তি না হওয়া অব্দি ক'টাদিন একটু সাবধানে চলাফেরা করার কথা ভাবতে থাকে ও। বিছানায় উঠে সবে শুয়েছে, হঠাৎ ওর সজাগ কানে একটা শব্দ এল। শব্দের উৎস যে পাশের বন্ধ ঘরই, সে বিষয়ে নিশ্চিত ও। ওই... ওই.... ওই রকম আওয়াজই তো হত, ওইভাবে হামানদিস্তায় পিষেই তো প্রতি রাতে চরণকে মিথ্যে শেকড়বাকড় খাইয়ে দিত দু'পয়সার লোভে। কিন্তু হামানদিস্তা তো এখন চৌকির নীচে। বিছানা পরিষ্কার করতে গিয়ে একটু আগেও ওর নজরে পড়েছে। তাহলে ওই আওয়াজ...?
আবারও একটা অট্টহাসি ভেসে এল গতরাতের মত, ‘ও হরিদা, শেকড়টা বাটো, বাটবে না ?’ধীরে ধীরে শব্দটা দেয়ালের কাছে আসছে,খুব কাছে, এবার মনে হচ্ছে কেউ যেন দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে চলেছে একটানা।তারপর এক অবর্ণনীয় পৈশাচিক অট্টহাসিতে কেঁপে ওঠে গোটা ঘরটা ।
||৩||
‘এ কী কান্ড, সারা শরীরে এত রক্ত ! তোমার মাথায় এভাবে কে মারল ছোটদা'বাবু ?’,সন্ধ্যেবেলা চা দিতে গিয়েই হরির চোখ পড়ে বিনোদের উপর । চিৎ হয়ে পড়ে আছে রক্তে ভেসে যাওয়া বিছানাটায়।আরও একটু এগোতেই পায়ে ঠেকে সেই জিনিসটা, সেই হামানদিস্তা , যেটা ওর ঘরের চৌকির তলায় রাখা ছিল।ভাবনা ঝেড়ে ফেলে আরও একটু সামনে গিয়ে দেখল, কপালের কাছে খানিকটা জায়গা থেঁতলে গেছে।কোনও কথা নয়, একটা আর্তচিৎকার ভেসে এল হরির মুখ থেকে।
কয়েকদিন পর আজ একটু সুস্থ বোধ করায় বাগানে বসে কাগজ পড়ছিল বিনোদ, ওকে দেখতে পেয়েই এগিয়ে যায় হরি। তারপর নীচু গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘ ওই হামানদিস্তা তুমি কোথায় পেলে ছোটদা'বাবু?এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে হকচকিয়ে যায় বিনোদ। ভ্রূ কুঁচকে বলে, ‘কী?' কিন্তু কিছু বলার আগেই, মুরারিবাবুর পায়ের শব্দে, সন্তর্পণে রান্নাঘরের দিকে চলে যায় হরি।
শ্রাদ্ধশান্তির পর বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে, এই ক'দিনে পুলিশও আর ডাকেনি ওঁকে ।তাই আজ একটু হালকা মেজাজে মুরারিবাবু। বিনোদকে ডেকে বললেন, আগামীকাল বিকেলে নাকি তার বাল্যবন্ধু বীরেশ আসবেন। বিনোদ ব্যাপারটা খানিক আন্দাজ করতে পারলেও, বাবার মুখের উপর আর পাল্টা প্রশ্ন করার সাহস পেল না।
সন্ধ্যে ঠিক ছ'টায় বীরেশের মোটরগাড়ি মেনগেট দিয়ে ঢুকে নুড়ি বিছানো রাস্তা পেরিয়ে সদর দরজার সামনে এসে হর্ন দিল। হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন মুরারিবাবু। ‘ওয়েলকাম, ওয়েলকাম, কতদিন পর দেখা ! ভালো আছো তো?’,বীরেশকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠকখানার দিকে এগোলেন মুরারিবাবু। হরিকে হাঁক দিয়ে বললেন , ‘দু'কাপ কড়া করে চা পাঠিয়ে দিস।আর বিনোদকেও এঘরে একবারটি আসতে বলিস।’
‘মেয়েটাকে সঙ্গে আনতে চেয়েছিলুম, তো মেয়ে আবার রাজী হলো না। বলছে পরে আসবে’, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলে চলেছেন বীরেশ। মুরারিবাবুও সহমতের সুরে বললেন, ‘আসলে চিরকালতো ছেলের বাড়ি থেকেই মেয়ে দেখতে আসে। তা মামনি বোধহয় ব্যাপারটা ঠিক...সে হবেক্ষণ। মেয়েতো আমার দেখাই আছে। এখন শুধু ছেলে ... ', কথা শেষ করার আগেই ঘরে ঢুকল বিনোদ। আজ প্রায় আট বছর পর বিনোদকে দেখলেন বীরেশ। স্বভাবতই প্রথমটায় একটু ভালো করে দেখে নিলেন। তারপর বললেন, ‘ইয়াংম্যান, কেমন আছ বলো?'
বিনোদ অস্বস্তিভাবটা নিয়েই বীরেশের মুখোমুখি হয়ে সোফায় বসল। ছোটবেলা বীরেশকাকার বাড়িতে সে অনেকবার গেছে, এমনকি ওঁর মেয়ে নীলিমার সাথেও খেলেছে। দীর্ঘদিন অদেখার ফলেই হোক ,অথবা সম্পর্কের সংজ্ঞাটা পাল্টে যাবার ফলেই হোক, বিনোদের একটুও স্বস্তিবোধ হচ্ছেনা। বিনোদ বুঝতে পারছে, ওর কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে । শরীরটা খারাপ লাগছে ওর। স্নায়ুগুলো শক্ত হয়ে আসছে যেন। কথাবলার মত শক্তি পাচ্ছেনা ও।
মুরারিবাবু আর বীরেশের খোশগল্পে ছেদ পড়ল একটা শব্দে।বিনোদের সামনের সেন্টার টেবিলে রাখা চায়ের কাপটা গড়িয়ে পড়েছে নীচে। কিন্তু দুজনের চোখ সেদিকে ছেড়ে এখন বিনোদের দিকে নিবদ্ধ। ঠকঠক করে কাঁপছে বিনোদ। চোখ গুলো উল্টে যাচ্ছে। সমস্ত শরীরে একটা খিঁচুনি উঠেছে। কম্পনের তীব্রতায় বিনোদ আর সোফায় বসে থাকতে পারছেনা। ওর শরীরটা কেমন যেন ধনুকের মত বাঁক নিচ্ছে। মুরারিবাবু কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিনোদ মেঝেতে ঢলে পড়ল। সমস্ত ঘরে এক পিনপতনের নৈঃশব্দ। ভেজানো দরজাটা একটা আওয়াজে হাট হয়ে খুলে যেতেই একযোগে দরজার দিকে তাকালেন দু'জনে। ‘আমি জানতাম, ও আসবে, ও আসবে’, হরির এহেন আচরণে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মুরারিবাবু, সঙ্গে বীরেশও।ঘরের মেঝেতে তখনও পড়ে আছে বেহুঁশ বিনোদের শরীরটা।
||৪||
‘মৃগী,হ্যাঁ, হ্যাঁ, মৃগীরোগ আছে তোমার ছেলের, বন্ধু হয়ে আমার মেয়ের জীবনটা এইভাবে নষ্ট করে দিতে চেয়েছিলে তুমি? ছিঃ! ভগবান আছেন, তাই আগে থাকতেই তিনি আমাকে সতর্ক করে দিলেন।’ ফোনটা নামিয়ে ধপ করে বিছানায় শরীর ছেড়ে দিলেন মুরারিবাবু।বাঁ হাতের কাছে পড়ে আছে এম.আর.আই রিপোর্টটা। আশঙ্কাটাই সত্যি হয়েছে। মাথায় অসম্ভব যন্ত্রণা হতে থাকে মুরারিবাবুর। সারা বাড়িতে আবার সেই গুমোটভাবটা যেন বাড়ছে একটু একটু করে ।
বিনোদ এখন একা একাই থাকে সারাদিন। ইচ্ছে হলে কথা বলে, নইলে বলে না। কুঁকড়ে থাকে সবসময়। অপমানে, লজ্জায় মিশে যেতে ইচ্ছে করে ওর। নিজের শহরে ফিরে এসে ভেবেছিল কোর্টে গিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করবে, কিন্তু তা আর কোনওভাবেই সম্ভব নয়। কারণ এমনিতেই মুখে মুখে রটে গেছে তার এই রোগের কথা। কোর্টে গিয়ে আর লোক হাসাতে চায় না ও।
রাত প্রায় একটা। হরি বিড়বিড় করতে করতে শোয়ার যোগাড় করছে। এমন সময় কানে এল, পাশের ঘর থেকে জল খাওয়ার ঢকঢক শব্দ হচ্ছে। দেয়ালে কানটা পাততেই হাড় হিম হয়ে যায় হরির। ওই ঘর থেকে স্পষ্ট ভেসে আসছে চরণের আওয়াজ। রাগে গিরগির করতে করতে বলছে, ‘কি শুনিস দেয়ালে কান পেতে? আমি চরণ। কাউকে ছাড়ব না। কাউকে না। ’ একটা অট্টহাসি মিলিয়ে যায় হাওয়ায়।
ঘর থেকে একছুটে বাইরে বেরিয়ে আসে হরি। তারপর দেখে একটা ছায়ামূর্তি চরণের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শুকিয়ে কাঠ হওয়া গলা দিয়ে অতিকষ্টে আওয়াজ বের করে বলে, ‘কে -কে -কে ওখানে?’ ছায়ামূর্তিটা যেন আরো এগিয়ে আসছে হরির দিকে, তারপর মণিহীন সাদা চোখে হরির দিকে এগিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, ‘দেয়ালে কান পেতে শোন, ওইঘরে কেউ ফাঁসি দেবে এখনই। হা হা হা হা। ’ বিদ্যুৎবেগে হরি দৌঁড়ে গেল ওর ঘরে, তারপর কাঠের সিন্দুকটা সরিয়ে জানলাটার সামনে দাঁড়াল। লোহার শেকলটা খুলেই শিকহীন জানলা টপকে ওঘরে ঢুকল। তারপর ফতুয়ার পকেট থেকে দেশলাইটা বার করে ধরাতেই ধাক্কা মেরে বিছানা থেকে ফেলে দিল লোকটাকে, চেঁচিয়ে উঠলো, ’ছোটদা'বাবু !’
||৫||
এই কয়েকদিনেই অমন সৌম্যদর্শন ছেলের এহেন চেহারা দেখে নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলেন না মুরারিবাবু।হরিকে ডেকে বললেন, ‘ঠাকুরমশাইকে একটা খবর দিয়ে আয় তো, যা।বলবি আজই আসতে।’হরি চলে যেতেই, ছেলের শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলোতে থাকেন মুরারিবাবু। ‘ ভুল করেছি, বড্ড ভুল করেছি’, স্বগতোক্তি করে ওঠেন অস্ফুটে।
দরজা খোলাই ছিল। জিপের আওয়াজ শুনে মুরারিবাবু এগিয়ে গেলেন সদর দরজার দিকে, তারপর ইন্সপেক্টরকে নিয়ে বৈঠকখানায় বসলেন। ইন্সপেক্টর মুখার্জিই শুরুটা করলেন।বললেন, ‘নিন নিন যা যা বলতে চান, শুরু করুন।’
নত মাথাটা এবার ধীরে ধীরে তুললেন মুরারিবাবু। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একটা চিরকূট এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই নিন, চরণের আসল ঠিকানা। আপনাদের মত আমিও চরণের ওই ভুল ঠিকানায় যাই একদিন। তারপর সেখান থেকেই আমার সন্দেহ গাঢ় হয়, যে চরণ কিছু একটা লুকোচ্ছে। এদিকে প্রায়দিনই চরণ আমার গাড়িতে বিভিন্নরকম স্ক্র্যাচমার্ক নিয়ে বাড়িতে ফিরত।শখের গাড়ি, তাই একটু আঁচড় লাগলেও রাগ হয়। অথচ আমি জানি ও বেপরোয়া ড্রাইভিং করে না। মনটা তাই খচখচ করতে লাগল। তারপর একদিন হরি এসে বলল, ও চরণকে ঘরের মধ্যে খিঁচুনি উঠতে দেখেচে বেশ কয়েকবার। কিন্তু আমার চোখে তখনও ব্যাপারটা পড়েনি। তাই সামনে ওকে কিছুই বলতে পারছিলাম না। এরপর ঘটনাটা ঘটল তার চারদিন পরে। কোর্টে একটা আর্জেন্ট হিয়ারিং থাকায় খুব তাড়াহুড়োয় ছিলাম। তাই একটু তাড়াতাড়ি চালাতে বলেছিলাম ওকে। কিন্তু কিছুদূর যেতেই, গাড়ি এলোমেলো ভাবে চলতে লাগল। চরণের হাতে শক্ত করে ধরা স্টিয়ারিং, কিন্তু নিশ্চল।ব্যাপারটা বুঝে উঠতেই আমার কয়েক মিনিট লেগে গেল। তারপর একটা বড় গাছে গিয়ে ধাক্কা খেল আমার গাড়িটা। বরাতজোরে সেদিন খুব বাঁচা বেঁচে যাই। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমেই বুঝতে পারি চরণের হুঁশ নেই। স্টিয়ারিংয়ে মাথা এলিয়ে পড়ে আছে ও। তখনই পুরো ব্যপারটা মেলাতে আর কোনও অসুবিধাই হল না। ইয়েস, হি হ্যাড এপিলেপ্সি।বাড়ি ফিরে একটু সুস্থ হতেই, রাতের বেলা ডেকে পাঠাই চরণকে। লজ্জায় সেদিন মুখ তোলেনি ছেলেটা। আমি সেদিন মাথা গরম করে ওকে অনেক কিছু বলেছি। বাড়ির লোকের অবহেলায় , তাচ্ছিল্যে বোঝা হয়ে যায় ছেলেটা।নিজের লোকের থেকে পালিয়ে একটা নতুন জীবন খুঁজতে চেয়েছিল ও। এই নিন, সুইসাইড নোট, এতে ওর সব কথাই লেখা আছে।’
দরজায় শব্দ হতেই ফিরে তাকান দুজনে। ঠাকুরমশাইকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকেছে হরি। মুরারিবাবু বলার আগেই শুরু করলেন ঠাকুরমশাই। বললেন, ‘হরির কাছে সব শুনেছি। আপনারা আর দেরি করবেননা। যত দ্রুত সম্ভব গয়ায় পিণ্ডদানের ব্যবস্থা করুন।’ মুরারিবাবু এবার ইন্সপেক্টর মুখার্জির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দিন কি শাস্তি দেবেন।' হরিও মনের বোঝা হালকা করতে চায় আজ। কিন্তু ঠোঁটের আগায় কথাটা এনেও চুপ হয়ে যায়, কারণ মুখার্জির মণিহীন সাদা নিষ্পলক চোখদু'টো ওর দিকেই চেয়ে আছে।
