ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ
পয়সা থাকলে ভূতের বাপের ও শ্রাদ্ধ হয়,কথাটা ছোটবেলায় বাবার মুখে শুনে শুনে কান ঝালা পালা হয়ে গেছিল পচার।তবে সত্যি সত্যি যে কোনোদিন ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ নিজের চোখে দেখতে পাবে সেটা অবশ্য সে নিজে পটল তোলার সময় ও ভাবতে পারেনি।
ওমা, অবাক হননি দেখি পটল তোলা শুনে,অবিশ্যি দিন কাল যা পড়েছে লোকজনের পটল খাওয়ার থেকে তোলার সম্ভাবনাই এখন বেশি।তা সে যাক গে,ভূত সমাজে তো আর এসব ছুঁই ছাতের রোগ নেই,আরে মশাই শরীরই নেই আর কে কাকে ছোঁবে।
ফিরে আসি আমাদের গল্পের নায়ক পচার কথায়, তা বেঁচে থাকতে তারও এক বাহারি নাম ছিল বটে,তবে চুল্লির এপারে এলে আগের জন্মের খোলসের সঙ্গে তার ওপরের স্ট্যাম্প লাগানো নামটাকে ও ছেড়ে আসতে হয়।সেইজন্য শিমুলতলার সাত্যকি মুখুজ্জে বছর পাঁচেক ধরেই মানে পঞ্চত্ব প্রাপ্তির পর থেকেই পচা নামে পরিচিত।
শুরুর দিকে যে দুঃখ একদম হত না তা নয়,একবার রাগ করে টাকলু জেঠু মানে ওই বেল গাছের ব্রহ্মদত্যি কে ধরেওছিল,আসলে বেঁচে থেকে তিনি উকিল ছিলেন আর মরার পর স্বর্গে না পৌঁছতে পারলেও ধানটা এখানেও ভানেন। ভূতসমাজের সব নিয়ম কানুন তার ওই বড় বড় নখের ডগায় আর কি।তা তার থেকে পচার জ্ঞানলাভ হয় যে নামের আগে চন্দ্রবিন্দু লাগার আগে অনেক তেনাদের নামের সঙ্গেই রাম,শ্যাম জুড়ে থাকে,এখানে ওইসব নাম উচ্চারণ করা মুশকিল,তাই ওই পচা,লংকা, টাকলু এইসব ডাকনামই চালু থাকে।
যাই হোক আসা যাক ভূতের বাপের মানে ভুতোর বাপের শ্রাদ্ধের কথায়।এদিকে এই শ্রাদ্ধ ব্যাপারটা কিন্তু বেশ শুভ একটা অনুষ্ঠান,মানুষ মরে ভূত হয় আর ভূত মরে মানুষ হয়।তাই ভূতের মরার শ্রাদ্ধটায় বেশ একটা অন্নপ্রাশন মার্কা ফিলিং থাকে যেখানে সদ্য গত হতে চলা ব্যক্তিকে তার পছন্দের ইঁদুরের কাটলেট,ব্যাঙের পায়ার কাবাব,আরশোলা ব্যাটার ফ্রাই এইসব সাধ মিটিয়ে খাইয়ে বিদায় দেওয়া হয়,বহু বছর এইসব 'কুইজিন' থেকে দূরে থাকতে হবে তাই।
তা ভুতোর বাপ মানে ভোম্বল খুড়োর শ্রাদ্ধে গিয়েই আমাদের হিরোর হিরোইনকে প্রথম দেখা।
ওঃ সে কি দৃশ্য মাইরি,পচা বন্ধুদের সঙ্গে এক কোনায় লুকিয়ে একটা বারো দিনের পুরোনো 'ব্লাডি তেরি' তে সবে চুমুকটা দিয়েছে আর তার চোখ গিয়ে পড়ল টেপির ওপর।আহা আমাদের টেপি সুন্দরী গো, ভোম্বল খুড়োর একমাত্র মেয়ে,তা সে বাপের বিয়ে তে সাজবে বলে এক মাস আগে গোবর ফেসিয়াল,লঙ্কা ডায়েট থেকে শুরু করে আজ পেট কাটা লেহেঙ্গায় নিজেকে সাজিয়ে বেশ ক্যাটরিনা ফিল করছিল। পচা টেপি কে এর আগে দেখে থাকলেও তেমন পাত্তা দেয়নি, ওই বন্ধুর ছোটো বোন যেমনি হয়ে থাকে আর কি।তবে আজ টপ টু বটম হট টেপিকে দেখে তো আমাদের পচা কুমারের 'কুছ কুছ হোতা হে' তে রাহুলের অঞ্জলি পার্ট টু কে দেখার মত হাল। শ্বাসনালিটা থাকলে ওই 'ব্লাডি তেরি' উলটো পথে ঢুকে ঠিক বিষম খেয়ে ভোম্বল খুড়োর সাথেই চন্দ্রবিন্দুটা মুছে যেত নাম থেকে।
কোন ছেলে কি নজরে দেখছে মেয়েরা ঠিক বোঝে,মরে গিয়ে টেপির আবার সেই বোঝার ক্ষমতা ও বেড়েছে।পচার ট্যারা নজর বুঝতে তার খুব একটা বেগ পেতে হয়না,দাদার বন্ধুর ওপর তার ও একটা হালকা ক্রাশ যে ছিল সে ও তো মিথ্যে না।
এরই মধ্যে হৈ হৈ করে গান বাজনা শুরু আর ভোম্বল জেঠু কে চ্যাংদোলা করে নিয়ে আসা সামিয়ানার নিচে, সব ভূত পেত্নিরা মিলে শুরু হয়ে যায় একেবারে জম্পেশ ভূতের নেত্য।এদিকে পচা আর টেপির চোখাচুখি চলতে চলতে হঠাৎ কার এক অসাবধানতার ধাক্কায় টেপি সোজা পচার ঘাড়ে।দুজনেরই হৃৎপিন্ড মিসিং হলেও লাব-ডুব আওয়াজ টা কেমন জোরে হওয়া শুরু হয়ে গেল,পরে অবশ্য বোঝা গেল ওটা ভোম্বল খুড়োর ব্যাঙের লেগ পিস চিবোনর আওয়াজ ছিল।তা এই ধাক্কায় দুজনের হাতের হাড় এমন একসঙ্গে জড়িয়ে মরিয়ে গেল যে আপনাদের বলতে ও কেমন লজ্জা করছে আমার।
"কি করছ,ছাড়ো"
"ছাড়ব বলে তো ধরিনি"
"আঃ,কেউ দেখে ফেলবে তো"
"দেখুক,বয়ে গেছে, আমি ভয় পাই নাকি"
"তবে রে মিনসে,এখানে এসে তবে এইসব হচ্ছে, দাঁড়াও আজ তোমার একদিন কি আমার একদিন"
আওয়াজটা কেমন একটা চেনা চেনা মনে হওয়াতে একটা ঠান্ডা নিঃশাস পচার গা দিয়ে নেমে যায়।
"গিন্নি...ত..তুমি এখানে?"
পাঁচ বছর আগে গত স্বামীকে ধিঙ্গি ঘাগড়া পড়া বুড়ির সঙ্গে লেপটে থাকতে দেখে রাগে দুঃখে জল চলে আসে সদ্য প্রয়াত সীমা মানে ভেবলির।
তাকে ও দোষ তো দেওয়া যায়না,পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করছেন এই দিনটার,এদিকে আসার পরই তাড়াতাড়ি বরের খোঁজ নিয়ে ছুটে এসে যদি নিজের বরকে কোন এক মেছো পেত্নীর সঙ্গে দেখেন কার আর মাথার ঠিক থাকে। বেগতিক বুঝে টেপি তো ততক্ষণে হাওয়া।
"গিন্নি গো, তুমি যেমনটা ভাবছ তেমন নয়, ওই নাচতে গিয়ে একটু ধাক্কা"
"থাক, সব জানা আছে আমার।শোনো এখন আমি এসে গেছি,বেগড়বাই করলেই এমন আড়ং ধোলাই দেব না ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ দেখতে পাবে।"
ভেবলিকে তারা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা মনে করিয়ে ধোলাই খাওয়ার রাস্তাটা পাকা না করে বুদ্ধিমানের মতই চুপ থাকল পচা।
এদিকে ভেবলি ফোঁস করে মনে করিয়ে দিতে থাকল সাত জন্মের সবে একটা গেছে ,আরো ছটায় তাদের কেউ আলাদা করতে এলে তিনি তাদের কেমন করে মোকাবিলা করবেন আর কি।
গিন্নিকে শান্ত করতে কেটারিং এর ছোকরার টার হাত থেকে টিকটিকির ডিমের রসগোল্লা একসঙ্গে গোটা চারেক নিয়ে তার মুখে ঠেসে হাঁফ ছাড়ে পচা।
মনে তখন তার একটাই চিন্তা,চিত্রগুপ্তকে একটু টেবিলের তলা দিয়ে কিছু দিয়ে নিজের শ্রাদ্ধের দিনটা তাড়াতাড়ি ম্যানেজ করতে হবে আর কি।
পচার অবশ্য জানা নেই চিত্রগুপ্তের সামনের শ্রাদ্ধের দিন এগোতে আসা ভূত গুলোর মধ্যে আধা হল যাদের স্ত্রী সদ্য ভূত সমাজে এসেছেন সেই বরেরা আর বাকি আধা যাদের স্বামী সদ্য শ্রাদ্ধ হয়ে জন্ম নেবে সেই স্ত্রীরা।আপনি কি ভাবলেন,আমাদের ভারতীয় বউ মানুষ যারা বরের জন্য ওপার থেকে এপারে আসার জন্য অপেক্ষায় থাকে তারা ওপার থেকে এপারে আসবে না?
