বইয়ের বিবরণে ফিরে যান প্রতিবেদন পর্যালোচনা

অনুশোচনা


#অনুশোচনা

#শর্মিষ্ঠা_KC


বিয়ের পর থেকে পারমিতার নানান কারণে খালি অনুশোচনা আসে। না, সব সময়ে খালি  মায়ের একমাত্র ছেলেকে  বিয়ের জন্য নয়; কখনো ওর প্রতিবাদী চরিত্রের জন্য, কখনো আবার ওর সংসার করার নেশায়  বোকার মতন  অমন নিশ্চিন্তের স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার জন্য, কখনো আবার  ফাঁকা এত বড় বেডরুমটার জন্য  ঘরের সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অনুশোচনায়  চোখের কোল বেয়ে জল-আল্পনা  আঁকে বালিশে। সেই দিন গুলোতে পারমিতা একদম চুপ মেরে যায়। শাশুড়ী বলেন "দুঃখ-বিলাস"। কী জানি, হবে হয়তো!!  সেদিন যদি অভিকের কথা না শুনতো, তাহলে হয়তো আজকের ওর এই দুঃখ বিলাসিতার কোন অবকাশই থাকতো না!! 


বিয়ের মাস খানেকের মধ্যে ওদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অতি সামান্য একটা খুনসুটির দরুণ , মা_এর সামনে  অভিক  ওকে  ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করতেই, পারমিতার হাতে ছিল এক জগ জল... মূহুর্তের তাড়নায় , ঘুরে দাঁড়িয়ে , ছুঁড়ে মেরেছিল সেই জলটা। যথারীতি , ঘরের সিনারিও চেঞ্জ । 


----এ কি বৌমা!! কী শিক্ষা নিয়ে এসেছ বাপের বাড়ির কাছ থেকে?....খোকা না হয় একটু মজাই করেছে, তাই বলে তুমি জল ছুঁড়ে মারবে!!??.


এক তীব্র অনুশোচনা ঘিরে ধরে ছিল পারমিতাকে , যখন দেখেছিল, ওর বর, অভিক মাথা  নীচু করে বসে, রাগে-অপমানে ফুলছে!!  ...ভীষণ এক দুর্দমনীয়  কষ্ট বুকের মধ্যে চেপে বসেছিল পারমিতার । ওর মনে হয়েছিল ওর কৃত কর্মের জন্যই  মায়ের কাছে নিচু হতে হয়েছে ওর  স্বামীকে। আর এই অপমানকে নিজের অপমান মনে করে  হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল পারমিতা। নিজের কৃত কর্মের জন্য সবিনয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করেছিল সেদিন।


বেশ কিছু  বছর  পার করেছে ওদের বিবাহিত জীবন।  


আজকাল, পারমিতা আবার নিজের একটা ছোট্ট জগৎ তৈরি করার চেষ্টা করছে। আজকে,  মা-ছেলের খুনসুটির কারণে বেশ অসুবিধা বোধ করে পারমিতা অন লাইন ক্লাস নিতে গিয়ে। নিজের বিরক্তিটা চেপে  রাখতে পারে না।  


----কী এমন  জিনিস করছিলে!!... মা বেটার একটু গল্পের আওয়াজে কী এমন আকাশ ভেঙে পড়েছে !! খোকা এরপর থেকে বৌমার অনুমতি ছাড়া আমার ঘরে আর আসিস না। 



---আমি কি তাই বলেছি , মা!!?

 এই বলে পারমিতা অসহায়ের মতন একবার বরের দিকে তাকিয়ে দেখে সে ব্যস্ত ফোনে।


----থাক, তোমার কাছে আমি এই বয়েসে এসে আর নতুন করে কিছু শিখতে বুঝতে চাই না।তাও যদি বুঝতাম নিজের পেটেরটাকে পড়াচ্ছো!! সেই কপালও তো করো নি!


পারমিতার পাশ দিয়ে অভিক ফোনে "হ্যালো, হ্যালো"  করতে করতে বারান্দায় চলে যায় ঠিকঠাক সিগন্যালের জন্য।


পারমিতা সব বোঝে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে আজ যথেষ্ট পরিণত।  চুপ করে যায়। তার নিঃশব্দ-ক্রন্দন  আজ আর কেউ শুনতে পায় না। 


------ কী রে,  অনুশোচনা হচ্ছে  আজকেও? কেন যে মরণ দশা প্রতিবাদ করতে যাস !!.. বেশ সুন্দর শান্ত ছিল ঘরের আবহাওয়া...কী প্রয়োজন তোর সব সময়  ঠিক , ভুলের ধ্বজা  বয়ে বেড়ানো!!? এখন মর তুই.... মর... মর কেঁদে ককিয়ে....


বালিশ চেপে ধরে পারমিতার মুখের ওপর। ওর দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় প্রায়। গোঁ গোঁ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় অভিকের।


------এই ...এই মিতা...বালিশটা এমন করে চেপে ধরে আছো কেন!!??..ছাড়ো , ছাড়ো বলছি..


লাফ দিয়ে উঠে বসে বিছানায় পারমিতা , অভিকের ডাকে। দরদর করে ঘামছে...নিজের বড় বড়  নিঃশ্বাসের আওয়াজ নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে ও !! 

----এমন করে কেউ নিজের মুখের ওপর বালিশ চেপে ধরে!!


ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে অভিকের দিকে।  একটু পর ধাতস্থ হলে   মুখে চোখে জল দিতে গিয়ে টের পায় বেশ ঝিরঝিরে একটা বৃষ্টির শব্দ। 


পারমিতা ওদের তিনদিক খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বারান্দাটা বেশ বড়সড়।  দেখার  মতন করে সবুজ করে রেখেছে ও এই জায়গাটা। সেখানে ঝুলিয়েছে পাখির বাসার আদলে একটা বেতের দোলনা।


 এসে,  ওর শখের বেতের দোলনাতে , পা গুটিয়ে , থুতনি টাকে হাঁটুর সামনে নিয়ে  জড়সড় হয়ে বসে পারমিতা। আবার একটা কষ্ট  দলা পাকিয়ে উঠতে থাকে গলার কাছটায়। ক্রমাগত ঢোক গিলতে থাকে চোখ বুজে। কানে আস্তে থাকে ওর বৃষ্টির রিনরিনে শব্দ। না- -চাইতেও আবার চোখের পাতা ভিজে আসে। একটু পর মাথার ওপর একটা  হাত অনুভব করে। চোখ খুলে দেখে সামনে অভিক।


----এ কি...তুমি আবার উঠে এলে কেন!!?... ঘরে যাও....


----হম...তুমিও চলো। তোমার যা ঠান্ডার ধাত!..এখনই হাঁচি শুরু হলো বলে!! 


কাকুতি ভরা সজল চোখে পারমিতা বলে,

 ----আরেকটু পর যাই?....ভোর হতে আর বেশি বাকি নেই....আজকে এখানে বসে একটু ভোর হওয়া দেখতে ইচ্ছে করছে যে আমার, অভিক!! 


----বিছানায় শুয়ে তো প্রায়ই ভোরের আলো ফুটতে দেখো মিতা, সে কি আমি জানি না ভাবছো!!


--- তুমি টের পাও!!!


অভিক কিছু না বলে পাশে রাখা  একটা ছোট্ট, কিন্তু একটু উঁচু স্টুল টেনে এনে বসে। 

-----সরি...


শ্লেষের হাসি মুখে নিয়ে, মনে মনে পারমিতা বলে, 

"আর কত বার... আর কত বার বলবে অভিক!! ... যেখানে বললে কাজে দেবে, সেখানে তো কোনো দিন বলে উঠতে পারলে না!!... সব দোষের ভাগী হয়ে পড়ে আছি আমি তোমার এই "সরি" শব্দটার জন্য। "সরি" শব্দটা কী অদ্ভুত না!!..কত ছোট, কিন্তু কত বড় বড় অন্যায় চাপা পড়ে যায় এই দু অক্ষরের নীচে!!"


---কিছু বলছো না যে মিতা!


অতি নিস্পৃহ স্বরে পারমিতা বলে,

----কী বলবো?


----সে সময় মাত্র কেরিয়ার উঠতে শুরু করেছে, বিয়ে হয়েছে মাত্র মাস ছয়েক... তখন একটা বাচ্চার দায়িত্ব নিতে আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম বলেই তোমায় জোর করেছিলাম অবর্ট করানোর জন্য, তা তো তুমি জানো?


----হুম...


গভীর আবেগে অভিক পারমিতার হাতদুটো চেপে ধরে।


----- তোমার ফেলোপিয়ান ট্যুবের যে এমন ক্ষতি হয়ে যাবে তা আমার দুঃস্বপ্নেরও অতীত ছিল মিতা!...ক্ষমা করো আমায়, ক্ষমা করো...

অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছি প্রতি নিয়ত.... প্রতি মুহুর্তে....


রাতের গভীর আঁধারে , প্রিয় নারীর সম্মুখে একজন পুরুষের  আত্মসমর্পণ , সেই নারীকে কিন্তু আজকে  বিচলিত করতে পারে ন!! পারমিতার শরীরী ভাষায় আজ আর কোনো পরিবর্তন হয় না সহজে। 


হঠাৎ দরজায় একটা 'খুট' করে আওয়াজ হয়। 

সেদিকে তাকিয়ে অভিক বলে,

----এ কি মা, তুমি!!... হাতে ওটা কী?


পারমিতার কিন্তু কোনো হেলদোল নেই। সে একভাবে বসে আছে সেই জড়সড় হয়ে।


---হুম... ভাগ্যিস এসেছিলাম। আর তাই আমার ব্রিলিয়ান্ট সন্তানের এমন একটা ব্রিলিয়ান্ট সিধান্ত_এর হদিশ পেলাম !!


এই বলে উনি পারমিতার পাশে গিয়ে ওর মাথায় হাত রাখেন। পারমিতা তখনো চুপ করে থাকে। খালি,  দোলনা থেকে পা দুটো নামিয়ে বাইরের দিকে নির্নিমেশ তাকিয়ে থাকে। 


 


------- বৌমা, কথায় বলে 'সন্তান না থাকলে এক জ্বালা, আর থাকলে হাজার জ্বালা'... সেটার একটা নমুনা আজকে আমার খোকা নিজেই দিয়ে দিল। 


পারমিতা বুঝতে পারে উনি কান্না চেপে রেখে কথা গুলো খুব কষ্ট করে বলছেন।


----- খুব জোলো একটা হাওয়া দিচ্ছে... এই পাতলা চাদর টা গায়ে দিয়ে বসো, মা ।


পরম মমতায় চাদরটা গায়ে জড়িয়ে দেন উনি।

 শরীরের সব কটা রোমকূপ দিয়ে ও যেন এই  মুহূর্তটাকে অনুভব করতে চায়! 


  আকাশ ভোরের সূচনা করে। পাগলপারা ঝমঝমে বৃষ্টিতে মাতোয়ারা চারদিক !!












পর্যালোচনা


আপনার রেটিং

blank-star-rating

বামদিকের মেনু