পুজোর আনন্দ
" ঠাম্মি, সামনে দেখ।"
নদীচরে কাশবনের দিকে তাকিয়ে রুনাদেবী হারিয়ে গেলেন ছোটবেলায়। তিনি আর তাঁর প্রিয়বন্ধু আলো একসাথে ছুটে যেতেন কাশবনের বুক চিরে।
" বন্ধু তো নেই। আমার সাথেই ছুটবে নাকি?" হেনা হাসতে হাসতে বলল।
" ছোটার ক্ষমতা কি আছে রে দিদিভাই?"
"তাহলে একটু হাঁটি।"
" তাই চল।" রুনাদেবীর চোখমুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। বড় হবার পর থেকে পুজোর সময় এক-দুদিনের জন্য সময় করে হেনা চলে আসে। ওর বাবা-মা তো সময় করে উঠতেই পারেনা বিদেশ থেকে এদেশে আসার। যাইহোক নাতনির এই একদিনের উপস্থিতিই রুনাদেবীকে সারা বছরের জন্য অক্সিজেন দিয়ে যায়।
সারাদিন হইচই করে, ঠাকুর দেখে ঠাকুমা-নাতনি সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে দেখল আলোদেবী এসেছেন।
" তুই বুড়ো হয়ে গেছিস তাই আমার নতুন বন্ধু হয়েছে।"
" হুম, দেখছি তো জায়গা দখল হয়ে গেছে।" আলোদেবী ছদ্ম অভিমান দেখিয়ে বললেন। তারপর দুই বন্ধু ডুবে গেলেন গল্প-আড্ডায়।
" কতটুকু সময়ের জন্য এলি। ঠাকুর দেখাও হল না।" অনুযোগ করলেন রুনাদেবী।
" নাতনির সঙ্গে তো দেখলি অনেক ঠাকুর।"
" তা দেখেছি। হেনাও এই ভর সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়েছে। অবশ্য তোর গাড়িতেই চলে যাবে বলছে তাই চিন্তা একটু কম। ওর চেনা একজনের বাড়ি যাবে কলকাতায় তারপর কাল দিল্লী যাবে। এই একদিনের জন্য এসেই ও আমার পুজোটা আনন্দে ভরিয়ে যায় রে।"
আলোদেবীর গাড়িটা চন্দননগরেই আলোদেবীর বাপেরবাড়িতে গিয়ে থামলো। পরদিন কলকাতা ফিরবেন তিনি। সবাই যখন আড্ডায় মশগুল তখন রুনাদেবীর ভাই রমেশবাবু এসে ঢুকলেন। আলোদেবীর সামনে গিয়ে সজল চোখে বললেন," কি বলে যে তোমায় ধন্যবাদ দেব!"
বছর পনের আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় বিদেশে প্রাণ হারায় রুনাদেবীর ছেলে-বৌমা আর নাতনি হেনা। সেই আঘাতে রুনাদেবীর শরীর-মন দুইই ক্ষতবিক্ষত হয়। শরীর সারলেও তাঁর মানসিক স্থিতি বিঘ্নিত হয়। তিনি বিশ্বাস করেন তাঁর প্রিয়মানুষগুলোর মৃত্যু ঘটেনি, তারা বেঁচে আছে। । বিশ্বাস ভাঙার চেষ্টা করলে রুনাদেবীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারতো তাই তাঁর বিশ্বাস ভাঙ্গার চেষ্টা কেউ করেনি। রুনাদেবীর স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে চলে আসেন রমেশবাবু। বিয়ের পর রুনাদেবী পাটনা আর আলোদেবী শিলিগুড়ি চলে যাওয়ায় যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল তাঁদের। রুনাদেবী চন্দননগরে ফিরে আসার পর আলোদেবী বন্ধুর মানসিক অবস্থা জানতে পারেন। ততদিনে আলোদেবীরাও কলকাতাবাসী হয়েছেন।
আলোদেবী রমেশবাবুকে বললেন," ছোটবেলায় পুজোর সময় কত মজা করতাম একসঙ্গে আর আজ রুনা চোখের জলে ভাসবে আর আমি আনন্দ করব তাই কি হয়? ধরে নেনা পুজোর উপহার হিসেবে একটা দিনের জন্য নিজের পুতুলটা রুনাকে খেলতে দিই, পুজোর আনন্দ ভাগ করে নিই সেই ছোটবেলার মত। এই একটা দিনের জন্যই ও সারাবছর খুশিতে থাকে আর কিছু চায়না, ভাবে না।"
" রমেশদাদু, পুজোর আনন্দ তো ভাগ করলেই বাড়ে। রুনাঠাম্মি যখন একমুখ হাসি নিয়ে আমার হাত ধরে মন্ডপে দেবীদর্শন করে, মজা করে তখন আমার পুজোর আনন্দও সার্থকতা পায়।" ঝরা শিউলির মত পবিত্র হাসি নিয়ে বলে উঠল আলোদেবীর নাতনি কুঁড়ি।
