বইয়ের বিবরণে ফিরে যান প্রতিবেদন পর্যালোচনা

বিভ্রম

#বিভ্রম


#রাখী_কুণ্ডু


ভীষণ জোরে একটা শব্দ , চারিদিকে আর্তচিৎকার আর তারপর সব অন্ধকার। এরপর যখন অয়নের চোখ খুললো তার মনে হল সে যেন এক মৃত্যুপুরির মধ্যে শুয়ে আছে, চারিদিকে শুধু অস্ফুট গোঙানির শব্দ। ওরা যাচ্ছিল পুরী। ঠিক রাত দশটার সময় ছেড়েছিল ওদের ট্রেনটা। ওরা মানে অয়ন ওর স্ত্রী শাশ্বতী আর ওদের ছেলে অরিন। টিকিটটা হয়েছিল একেবারে শেষ মুহূর্তে তাই এক জায়গায় সিট হয়নি ওদের।অয়নের সিট হয়েছিল একেবারে পিছনের দিকে আর ওর স্ত্রী পুত্রের অনেকটা সামনের দিকে।


ওদের কথা মনে পড়তেই ধড়ফড় করে উঠে বসল অয়ন। কামরার মৃত্যু-মিছিলকে সাবধানে অতিক্রম করে কোন মতে বেরিয়ে এলো বাইরে। বাড়ি থেকে রাতের খাবার খেয়েই বেরিয়েছিল ওরা, তাই ট্রেনে উঠেই স্ত্রী পুত্রকে নির্দিষ্ট বার্থে শুইয়ে দিয়ে নিজেও এসে শুয়ে পড়েছিল অয়ন ওর জন্য নির্ধারিত আপার বার্থটায়। তারপর মাঝরাতে ধু-ধু এক প্রান্তরে কোন এক অনিবার্য কারণে  দাঁড়িয়েছিল ওদের ট্রেনটা, আর পিছন থেকে এসে ওদের দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটাকে ধাক্কা মেরেছিলো অন্য একটি ট্রেন। দুমড়ে মুচড়ে গেছিলো পিছন দিকের বেশ কয়েকটা কামরা। ঘুমের মধ্যেই ভীষণ জোরে শব্দ, তীব্র একটা ব্যথার অনুভূতি  ব্যস আর কিছু মনে নেই ওর।


       বৌ বাচ্চার খোঁজে যত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে ততই মানুষের গোঙানির শব্দ তীব্রতর হচ্ছে। মনটা হু হু করে উঠছে ওর। বুকের ভিতর লক্ষ্য হাপরের ওঠাপড়া টের পাচ্ছে অয়ন, জীবিত দেখতে পাবে তো ওদের? তবে আধা অন্ধকারে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে  এদিকে  ক্ষয়ক্ষতি অপেক্ষাকৃত কম হয়েছে। "ঠিক আছে তো শাশ্বতীরা?" এখন এই একটাই চিন্তা কুরে কুরে খাচ্ছে  ওকে। অতিরিক্ত টেনশন হলে বারে বারে মাথার চুলে হাত বুলিয়ে নেওয়া স্বভাব অয়নের।কলেজবেলায় তার এই  স্টাইলের ফ্যান ছিল শাশ্বতী। ভাবতেই চোখে জল এসে গেল অয়নের আর আপনাআপনি এখনও মাথায়  চলে গেল হাতটা।  কিন্তু চুলের বদলে চটচটে কিসে যেন হাত লাগলো তার। বিস্মিত হয়ে মাথায় আরো একবার হাত দেওয়ার আগেই সামনের ভাঙাচোরা দরজাটা দিয়ে শাশ্বতীকে কোনরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে ছুটে গেল অয়ন। বাড়িয়ে দিল সাহায্যের হাত কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে ট্রেনের পিছনের দিকে এগিয়ে গেল শাশ্বতী অরিনের হাতটা ধরে আর কাঁদতে কাঁদতে একটানা চিৎকার করে চলেছে---- "অয়ন, অয়ন।"

        

              অয়নের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। প্রচন্ড আঘাতে পাগল হয়ে গেল নাকি?   সে তো ওদের পাশে পাশেই হাঁটছে, অনেক কিছু বলেও চলেছে কিন্তু কিছুই শুনছেনা কেন ওরা!! ওকে যেন দেখতেই পাচ্ছেনা শাশ্বতী। প্রথমে ভীষণ রাগ হলো পরক্ষণেই মনে হলো "তবে কি! তবে কি!...."


             নিজের কামরাটার দিকে দৌড়ে গেল অয়ন। আবার অনেক  কষ্টে  ভেতরে ঢুকে দেখতে পেল কামরার সেই মৃত্যু মিছিলের মধ্যে নিজের ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত লাশটাকে। মাথার খুলিটা সম্পূর্ণ উড়ে গেছে কোন এক তীব্র আঘাতে। এক নিমেষে সব বিভ্রম কেটে গেল অয়নের।

পর্যালোচনা


আপনার রেটিং

blank-star-rating

বামদিকের মেনু