সেকেন্ড ইনিংস
#সেকেন্ড_ইনিংস
#রাখী_কুন্ডু
বাইরের বারান্দায় উদাস হয়ে বসে ছিলেন দীপকবাবু।এই ঘর বাড়ি, এই ছোটবেলাকার পাড়া ছেড়ে চলে যেতে হবে তাঁকে। বৃদ্ধাশ্রমে কথা বলা হয়ে গেছে সৌমর। দীপকবাবু কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। সেদিন সৌমদীপ বললো,
----- তোমার কাছেই তো ছোটবেলায় কত গল্প শুনেছি বাবা, আগেকার দিনে লোকেরা শেষ বয়সে বানপ্রস্থে যেত। তাহলে তোমার আপত্তি কোথায়?
আর কিছু বলতে পারেননি তিনি। সত্যিই তো তিনি এখন অচল পয়সার সমতুল্য। সরকারী চাকরিজীবী হলে তবু পেনশনটা তো পেতেন।
আজ পুরানো দিনের কথা বড্ড মনে পড়ছে দীপকবাবুর। ছোটখাটো একটা হার্ডওয়ারের দোকান ছিল ওনাদের। অভাবের মুখ দেখতে হয়নি কখনো। বাজারের মধ্যে দোকান, ভালোই চলত। কিন্তু ওই যে সুখের পরে নাকি দুঃখের ঙআনাগোনা মানুষের জীবনে, সে কথাকে সত্যি করেই দীপকবাবুর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ঠিক আগেই মারা গেলেন বাবা। দোকানে বসে থাকতে থাকতেই ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে। পরে ডাক্তার কাকুর কাছে দীপকবাবু শুনেছিলেন ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। মা, ছোট বোন সবার দায়িত্ব এক নিমেষে এসে পড়েছিল দীপকবাবুর উপরে। উনি অস্বীকার করেননি সে দায়িত্ব। অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন , অত বড় বিপর্যয়ের পরেও উচ্চমাধ্যমিকে রেজাল্ট করেছিলেন নজরকাড়া। কিন্তু আর ভর্তি হওয়া হলো না, দোকানদারীটাকেই নিজের ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিলেন তিনি।
কালের নিয়মে বোনের বিয়ে, নিজের বিয়ে, সবই হলো। ওনার আর সৌমীর জীবনে এলো সৌম্যদীপ। বেশ চলছিল, তবে ছেলেকে ঠিকমতো মানুষ করতে পারেননি তিনি এটাই ওনার আক্ষেপ। একটি ছেলে বলে অতিরিক্ত আদরেই হোক অথবা সঙ্গদোষেই হোক সৌম লেখাপড়া করলনা বেশি দূর। টেনে টুনে বিএ পাস, ব্যস পড়াশুনার ইতি। উনি পড়াশোনা ছেড়ে ছিলেন পরিস্থিতির চাপে, আর সৌম ছাড়লো সঙ্গদোষে।
সারাদিন বাইক নিয়ে টোটো করে ঘুরে বেড়াতো সেসময়। বিয়েও করল নিজের পছন্দের মেয়েকে। সৌমীর কথায় উনি মেনেও নিয়েছিলেন সে বিয়ে। তারপর বছর না ঘুরতেই নাতনী তিতলি এল। আর কি চাই? নাতনীর যখন বছর দু'য়েক বয়স সেই সময় দীপকবাবুরও একটা ছোট্ট অ্যাটাক হলো সেই দোকানেই। ব্যস সৌমী হুকুম জারি করল দোকান যাওয়া বন্ধ। সেই থেকে সৌম্যদীপই বসে দোকানে। সেও হয়ে গেল আজ পাঁচ বছর। আর আগের বছর তো সৌমীও ছেড়ে চলে গেল দীপকবাবুকে।
"কী অত ভাবছিস বসে বসে?" হঠাৎ ডাকে চমক ভাঙ্গলো ওনার, দেখেন সামনে দাঁড়িয়ে বাল্যবন্ধু মোহন। সকালের দিকে মাঝে মাঝে উনি আসেন আড্ডা দিতে বন্ধুর বাড়ি।সৌমী থাকতে সকালের জলখাবার আর চা না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়তোনা মোহনকে। এখন আর চায়ের কথাও বৌমাকে বলতে পারেননা দীপকবাবু। সত্যিই তো কত কাজ একা হাতে সামলাতে হয় বৌমাকে। বন্ধুকে বসিয়ে বৃদ্ধাশ্রম এর কথাটা বললেন দীপকবাবু। চমকে উঠলেন মোহনবাবু ,
----সেকি এ আবার হয় নাকি!
----- হয় বন্ধু হয়! নাহলে যে ওদের যে বড্ড অসুবিধা। আমি একটা ঘর জুড়ে আছি, ওটাকে তিতলির পড়ার ঘর বানাবে ওরা। জায়গার বড্ড অভাব, তাই আমাকে জায়গা ছাড়তে হবে।
আজ আর গল্প জমল না একরাশ মন খারাপ নিয়ে উঠে গেলেন মোহনবাবু।
সন্ধ্যাবেলা তাড়াতাড়ি ফিরল সৌম্যদীপ। বাবার ঘরে ঢুকে দেখল উনি দাঁড়িয়ে আছেন স্ত্রীর ছবির সামনে।
---- বাবা সব গোছগাছ করে নিও তাড়াতাড়ি। সামনের সপ্তাহেই তোমাকে 'অপরাহ্নে' নিয়ে যাব। ওখানকার পরিবেশ বেশ ভালো, দেখো তোমার ভালো লাগবে। দীপক বাবু উত্তর দিলেন
---- একা বুড়ো মানুষের আর কি-ই বা গোছগাছ!
বাবার গলার বিষাদের সুরটা ধরতেও পারলোনা সৌম্যদীপ। বলল,
------ বাবা আমি আর তোমার বৌমা একটু বেরোচ্ছি। তাড়াতাড়ি ফিরবো। তিতলি পড়ছে। তুমি যেন আবার ওকে গল্প শোনাতে বোসো না।
চলেই তো যাবেন আর কটা দিন পরেই তবু কত বিধিনিষেধ। আজকালকার বাচ্চাদের নাকি রূপকথার বোগাস গল্প শোনাতে নেই, ওগুলো নাকি ফালতু সময় নষ্ট। কিন্তু দিদিভাই তো খুব খুশি হয় গল্প শুনতে পেলে। কিছুই মাথায় ঢোকে না দীপকবাবুর, চলে যাওয়াই হয়তো ভালো। ওখানে নিজের বয়সী সমমনস্ক কিছু মানুষ তো পাবেন।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আর এক। নাঃ, সেদিন তাড়াতাড়ি ফেরা হয়নি ওদের, দীপকবাবুরও বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া হয়নি। সেদিন বাইকে বেশ বড়সড় একটা এক্সিডেন্ট করেছিল সৌমদীপ। ওর স্ত্রী সোনালীর চোট সামান্যই কিন্তু সৌম্যদীপের স্পাইনাল কর্ড ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আর কখনো হাঁটাচলা করতে পারবে কি না তার গ্যারান্টিও ডাক্তার বাবু দিতে পারেননি।তিতলি একসময় চুপি চুপি বলেছিলো,
-----জানো তো দাদুন, ভগবান না বাবাকে শাস্তি দিয়েছে। তোমাকে বের করে দিচ্ছিল বাড়ি থেকে তাইজন্য।
----ছিঃছিঃ, দিদিভাই এমন কথা বলতে নেই। আমার আয়ু নিয়েও যেন বেঁচে থাকে আমার সৌম।
সময় থেমে থাকে না। বাড়ি ফিরেছিলো সৌম্যদীপ কিন্তু পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে। দোকান বন্ধ প্রায় একমাস। সৌমর চিকিৎসায় জলের মতো টাকা-পয়সা খরচ হয়ে গেছে। জমানো টাকা দিয়ে আর কতদিন? থমথমে পরিবেশ বাড়িতে। ছোট্ট তিতলিটাও কেমন যেন চুপ করে গেছে। সেদিন হঠাৎই ডিসিশানটা নিলেন দীপকবাবু।
সকালবেলাতেই ছেলের ঘরে গিয়ে দাঁড়ালেন। সোনালী জলখাবার খাওয়াচ্ছিলো সৌমকে। উনি বললেন,
----- বৌমা দোকানের চাবিটা দাও।
চমকে দুজনেই তাকালো ওনার দিকে। মৃদু হেসে উনি বললেন,
----- হ্যাঁ আবার আমি শুরু করবো। কিছুতেই আমরা হারবো না।আমার দিদিভায়ের মুখে আমি হাসি দেখতে চাই।
উজ্জ্বল হয়ে উঠল সৌম্যদীপের মুখ।বললো,
----শিগগিরি বাবাকে চাবিটা দাও সোনালী, আমি জানি বাবা পারবে।
আজ প্রায় ছ মাস হয়ে গেল আবার দোকান যাচ্ছেন দীপক বাবু। এই ৬৮ বছর বয়সেও যে কোন যুবকের সাথে পাল্লা দিতে পারেন তিনি। খুব নিয়ম মেনে ডাক্তারবাবুর কথামতো চলেন। আর সৌমদীপ? সেও সেরে উঠছে তবে খুব ধীরে। দীপকবাবু দেখিয়ে দিয়েছেন বানপ্রস্থে যাওয়াটা আজকের দিনে শুধুই গল্প কথা।
সমাপ্ত।
