মালতির মা
https://www.facebook.com/groups/1025958611095712/permalink/1592665531091 মালতির মা #কলমে সারদা গোধূলীবেলার মিঠে আলোয় গ্রামের শেষ প্রান্ত মোড়াম বিছানো পথটি ধরে হাঁটতে বেশ লাগছে অনুভার মানে প্রফুল্লবালা বালিকা বিদ্যালয়ের বড় দিদিমণি অনুভা
সেনের।যদিও এ তল্লাটে তিনি বড়দি নামেই জনপ্রিয়। এই পথটাতে বেশ কটা কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে।তার রক্তিম আভা আজ ঈষৎ যেন তাঁর ঠোঁটের কোণে।মন তাঁর বড়ই পরিতৃপ্ত। বিশ্ব নারীদিবসে জন্য আয়োজিত এতবড় সভাতে তিনিই তো সভাপতির আসন অলংকৃত করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে গোটা সভাগৃহ হাততালিতে ফেটে পড়েছিল।এইটুকু সম্মান তো সত্যিই তাঁর প্রাপ্য।পড়াশুনা,আত্মপ্রতিষ্ঠা আর স্কুলের চাকরির ছাব্বিশটা বছর তিনি শুধু নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করেছেন।কোথাও কোনো খামতি নেই।বিয়ে পর্যন্ত করেন নি পাছে কোথাও ভারসাম্যের বিঘ্ন ঘটে । জীবনের পঞ্চান্নটা বছর ভালোই পার করেছেন... একা,স্বাধীন,স্বাবলম্বী।আজকের অনুষ্ঠানে পরানো সভাপতির ব্যাচটা এখনও শাড়িতে আটকে আছে। হাতে আছে একটা লাল গোলাপ।যেন বিজয়িনীর জয়ধ্বজা।ধীর পায়ে মালতির মায়ের কুঁড়েঘরটার দিকে তিনি এগোচ্ছেন।এতদিন স্কুলে আছেন কিন্তু কোনদিন এদিক টা দেখাই হয়নি তাঁর। মালতির মাও তো আজ পনেরোটা বছর স্কুল কাজ করে মানে স্কুল বিল্ডিং ঝাঁট দেওয়া,বাগানের গাছে জল দেওয়া,দিদিমনিদের এঁটো বাসন মাজা এই আর কি। মালতি মরেছে ম্যালেরিয়ায় তাও বছর দশেক আগে। আর স্বামীতো কবেই তাকে ছেড়ে দিয়েছে তাইতো পেটের দায়ে এই গ্রামে থাকা।তারপরের ঘটনা তো ইতিহাস।গ্রামের সামন্ত বাড়ির গজানন সামন্ত কে দেখাশোনার কাজ পেয়েছিল মালতির মা।গজানন বিপত্নীক।ছেলেরা বিয়ের পর ভিন্ন হয়েছে। আর গজানন তো বাতের ব্যথায় ভালো চলাফেরা করতে পারে না। তাই গজাননের সেবার ভার পড়েছিল মালতির মায়ের উপর।সামন্তরা এই গ্রামের সবচেয়ে বড় লোক ।মালতির মা ভেবেছিল বুঝি এভাবেই দিন চলে যাবে।বিধি বাম।মালতির মা হল সন্তান সম্ভবা।সবাই বুঝল এ কার কাজ।তবে সামন্তদের প্রতিপত্তির ভয়ে সবার মুখে কুলুপ।মালতির মাও কাউকে কিছু বলেনি।নিঃশব্দে যাবতীয় লাঞ্ছনা, গঞ্জনা মাথায় নিয়ে ছেলেটার জন্ম দিয়েছেগ্রামের শেষ প্রান্তের এই কুঁড়েঘরে। তারপর স্কুলকে কেন্দ্র করেই বেঁচে থাকার লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছে।স্কুলের মিড ডে মিল থেকে বাগানের দেখাশুনা সব কাজেই মালতির মা একমুখ হাসি নিয়ে হাজির।আজ তো অনুভা দেবী তার কাছে নিজের ভারী ব্যাগটা রেখে দিয়ে স্কুল থেকেই চলে গেলেন সভাতে।ফেরার পথে তাই ব্যাগটা নিতে আসা। কুঁড়েটার সামনে মালতির মা বাসন মাজছিল। বছর সাতেকের ছেলেটা চাটাইএ বসে ছবি আঁকছে।বড়দি কে দেখে দুজনেই শশব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এল।দুইজনের মুখেই অকৃত্রিম হাসি।ছেলেটা কাশছিল। মালতির মাই বলল দুদিন ধরে নাকি জ্বর।ওষুধও খাইয়েছে।অবশ্য এখন একটু ভালো ।তাই তো আর্ট করতে বসেছে মালতির মার মুখে গর্বের হাসি।ছেলেটার খুব মাথা বড়দিদিমনি!কোন ঘরের ছেলে তো বলতে হবে।বড়দি বিষন্ন হাসেন। তোমার রাগ হয়না মালতির মা? মালতির মা দার্শনিকের মতো উদাস চোখে বলে যাঁর যেমন মতি।আমার কাজ তো আমি করি বড়দি।বড়দির চোখে জল।এমন শক্তি,ক্ষমা,ধৈর্য্য তাঁর হবে না। হঠাৎ তিনি মালতির মা কে জড়িয়ে ধরেন।তারপর সভাপতির ব্যাচটা খুলে আধময়লা শাড়িটিতে আটকে দেন।হাতে ধরান লাল গোলাপটা।মালতির মা হতচকিত। কিছুই বুঝতে পারে না সে। কিন্তু আজকের প্রকৃত বিজয়িনী কে সে বুঝতে বাকি নেই বড়দিদিমনির।।মালতির মার মুখে আবার সেই একগাল হাসি।এবার বড়দিদিমনিও প্রাণখুলে হাসেন।চাটাই এর উপর বসে পড়ে কপট রাগ দেখিয়ে বলেন ওতো বুঝতে হবে না তোমাকে!না ও তো মালতির মা এককাপ কড়া করে চা করো তো।মাথা যে ছিঁড়ে গেলো।
