হার মানা হার
#কলমে সারদা এবারও মনে হয় হল না বলতে বলতে দ্রুত গতিতে বাড়ি ঢুকল ঋজু। ঋজু এষার দাদা। এই নিয়ে ষোল বার এষাকে দেখানো হল কিন্তু প্রতিবারই নাকচ। আসলে গায়ের রঙটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋজু,এষার মা তো টকটকে সুন্দরী ।তবে ঋজু মায়ের সৌন্দর্য পেলেও এষা হয়েছে ঠিক তার বাবার মতো বেশ কালো।তবে বাবার মতোই উজ্জ্বল কালো চোখ দুটি যে কোনো মানুষ কে আকর্ষণ করে। তাছাড়া এষার মতো শান্ত গুণী মেয়ে তো সহজে মেলে না।তবে বলে না...পহেলে দর্শন ধারী তারপর গুণ বিচারী।দেখাশুনা সেই কলেজের প্রথমবর্ষ থেকেই শুরু হয়েছিল দেখতে দেখতে এষার এম.এ পরীক্ষার ফল বেড়নোর সময় হয়ে গেলো। কই আশার আলো তো দেখা গেলো না।এবারটা কিন্তু অন্য রকম। প্রথমে হতাশ করলেও ছেলের বাবা পরে উৎসাহী হয়ে জানালেন তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর কিন্তু মেয়েকে খুব পছন্দ হয়েছে ছেলে অবশ্য নিমরাজি তবে সেতো কোনদিনই তার মা বাবার অবাধ্য হয় নি। অতএব জোর কদমে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে হল।এমন সুদর্শন ডাক্তার পাত্র...বাড়িতে খুশীর জোয়ার।এষা কিন্তু অজানা ভয়ে শঙ্কিত।যার সাথে তার আজীবনের সম্বন্ধ সেই যে চায় না তাকে।বিয়ের আর তিনদিন বাকি আত্মীয়স্বজন বাড়িতে আসতে শুরু করেছে হঠাৎই ছেলের বাবা জানালেন ছেলে বেঁকে বসেছে।তাকে কিছুতেই বিয়েতে রাজি করানো যাচ্ছে না।তাঁরা লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী।বাড়ির সবাই প্রায় বজ্রাহত।আর এষা লজ্জায় অপমানে বিষ খাবেই ভেবেছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলেছে সে।এরপর জীবন শুধু লড়াই এর ময়দান। দূরের এক শহর গেছে বিএড করার জন্য। তারপর তো পাগলের মতো চাকরীর চেষ্টা । যদিও এ যুগে চাকরি আর মরুভূমিতে জলাশয় খোঁজা একই ব্যাপার তাই বারবারে নিরাশও হয়েছে।অবশেষে চাকরী মিলেছে ঝাড়খন্ডে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় একটি বেসরকারী অবৈতনিক স্কুলে।আদিবাসি ছাত্ররা এখানে সম্পূর্ণ নিখরচায় পড়াশুনা করতে পারে।ঝাড়খন্ডের অপরূপ প্রকৃতি আর এই সরলমতি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে জীবনের মূল্যবান দিন গুলো বেশ কেটে গেছে এষার।রোদে জলে ঘুরে ঘুরে দহন করেছে নিজের শরীর ও মনকে। নির্বান্ধবপুরীতে শহুরে জীবন কে সম্পূর্ণ ত্যাগ করে পঞ্চতপা পার্বতীর মতো নিজেকে সকলের জন্য উৎসর্গ করার ব্রতে সমর্পণ করেছে।
চুল পেকেছে প্রায় সবই চমশার কাঁচ হয়েছে পুরু। তবে মনের সারল্য আর মিষ্টত্ব রয়েই গেছে আগের মতো।এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাৎসল্য আর অসীম মমতা।স্কুলের ছাত্রদের কাছে সে মায়ের মতো।তার ভালোবাসার ব্যাপ্তি ছড়িয়ে গেছে স্কুলের গন্ডী ছাড়িয়ে গ্রামের ঘরে ঘরে।সবাই তো দিদিমনি বলতে অজ্ঞান। রবিবারের সকাল,স্কুল সংলগ্ন কোয়ার্টারের বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল এষা।এমন সময় হঠাৎ বুধিয়া এল ছুটতে ছুটতে।ছোট ছেলেটার জ্বর যে কিছুতেই কমছে না।
শহরে যেতে হবে ডাক্তারের খোঁজে।হাতে টাকা নেই।দিদিমনিই তাই ভরসা। পথে রামুয়ার সঙ্গেও দেখা।রামুয়ার কথাতেই স্থানীয় হেল্থসেন্টারে ছুটে গেলো এষা ও বুধিয়া।এখানে নাকি এক ডাক্তারবাবু এসেছেন ভগবানতূল্য!গরিব মানুষদের তিনি নিখরচায় শুধু চিকিৎসাই করেন না নিজে ওষুধ ও পথ্য কেনার টাকাও দেন। বুধিয়ার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হলনা। অসম্ভব সুদর্শন,সৌম্যকান্তি মধ্যবয়সি এই ডাক্তারবাবু কেমন চেনা চেনা লাগলো এষার। সারাদিনের ধকলের পর বুধিয়াদের বাড়ি থেকেই একাই ফিরছিল এষা। ডাক্তারবাবুই জোর করে তার সঙ্গী হলেন।সারাদিন ছোটাছুটিতেই কেটেছে।সন্ধ্যা আগত প্রায়।চারিদিকে অদ্ভূত নিস্তব্ধতা। অস্তাচলের সূর্যের দিকে তাকিয়ে ডাক্তারবাবু হঠাৎ বলে উঠেন আচ্ছা এষা তুমি কি এখনও আমাকে ক্ষমা করোনি?ডাক্তারবাবুর মুখে নিজের নাম শুনে চমকে উঠল এষা। মানুষটাকে চিনতে সে ভুল করেনি।শুধু ম্লানমুখে হেসে বলল আমি ভালো আছি।আপনি ভালো তো।ডাক্তারবাবুর মুখেও বিষণ্ন হাসি। এর পর তিনি যা বললেন সেটা শুনে শুধু এষা কেনো সবাই বিষ্মিত হবে।যে মানুষটার নির্দয়তার কথা ভেবে একদিন নিজেকে সে তিলে তিলে দগ্ধ করেছে আর দীর্ঘ বেদনায় মন টাকে অসাড় করেছে আজ নতুন করে তার কথায় স্তম্ভিত ।এই মানুষটিই নাকি এক দুরারোগ্য ব্যধিতে ভুগছিলেন ।বাবা মার কথা তে প্রথমে অনিচ্ছাকৃত ভাবে রাজি হলেও পরে একজন ডাক্তার হয়ে একটি মেয়ের জীবন কে নষ্ট করতে পারেনি।তাইতো শেষ মুহূর্তে এই বিয়ে থেকে সরে আসা।যদিও আজ তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে এষা ছাড়া কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবতে পারেন না আর এষা তো আজও অনূঢ়া। তাই যদি সেদিনের অপূর্ণ কাজটি আজ গোধূলীবেলায় পূর্ণ করা যায়। এষা ঘাড় নারে,না!আজ কোন অপূর্ণ কাজই সে পূর্ণ করতে চায় না।কারণ তার জীবন আজ কানায় কানায় পূর্ণ শত শত মানুষের ভালোবাসায়।মানুষের সেবা করার অধিকার পেয়েছে সে।এই কাজই করে যেতে চায় জীবনের শেষে দিন পর্যন্ত। এষা তাড়াতাড়ি করে। সন্ধ্যায় তাকে বয়স্ক শিক্ষার ক্লাসে যেতে হবে যে।প্রথমে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয় তারপর ধীর কিন্তু দৃপ্ত পদে এগিয়ে যায় এষা।ডাক্তারবাবু স্তব্ধ.....চোখে তাঁর বিষ্ময় আর অপার শ্রদ্ধা।
