Back to Book Details Report Reviews

অভিমান

প্রিয় আত্মা,

মনে কি আছে তোর? আমার কলেজে পর্যন্ত বাইক নিয়ে ছুটে এসেছিলি, দিদির জন্য শুধু? আমায়  বলেছিলি সিম রেখে দে আমার টা। আমি বলছিলাম না লাগবে না, সিম দিয়ে কি করবো, আছে তো( মায়ের টা), আমার তো এখন লাগে না, আমার তো ফোন নেই। বলছিলাম, বল তো তোর নাম্বার কি দিয়ে সেভ করা, ফোন টেনে নিয়ে দেখতে চাইছিলি, আমি দেয়নি প্রথমে, তারপরে নিয়ে কল দিলি, নাম টা ভেসে উঠলো, আমি টান দিয়ে নিয়ে নিছিলাম।

রাতে ঘুমানোর আগে কথা বলে তারপরে ঘুমাতাম মনে আছে! কোচিং এ যখন ঢাকাতে গেলাম, বলতি এই শোন না দিইই, আমি যদি ধর হঠাৎ একদিন বলি, নিচে নাম, নেমে দেখলি আমি দাঁড়ানো।

একদিন হঠাৎ এসে দাঁড়িয়ে বসবো, কেমন হবে বল তো?

প্রতিদিন গুড মর্নিং পাঠাতি, খেয়েছি কিনা, মশারী টানিয়েছো কিনা,

মনে আছে, প্রতিদিন কথা হতো তোর আর আমার?

মনে আছে তোর মোবাইল নিয়ে গেলে, দাদুর মোবাইল দিয়ে আমায় বার্তা পাঠাতি?

মনে আছে তোর? বাড়িতে যাবি সকালে ভাত খাচ্ছিলি, আমি ইলিশ মাছ না, কি মাছ নিয়ে নিয়ে দিলাম, দিয়েছে আমি চলে যাচ্ছিলাম, এই করে ডেকে নিয়ে বললি হা কর? হা করতে ভাত দিয়েছিলি মুখে। আবার দিতে চাইছিলি, বললাম না তুই খা।

মনে আছে তোর বাড়ি যাওয়ার আগে আমার কান্না থামতো না, বাড়ি যাওয়ার আগে আমায় আদর করে যেতি, একদিন শুয়ে ছিলাম, বাম গালে অনেক চুমু খেয়ে, কান কামড় খেয়ে বসে বলেছিলি, খেয়ে ফেলবো কিন্তু!

আবার আসবো, আজ যাই?

মনে আছে, তোর যাওয়ার সময় এক টুকরো চিঠি দিয়েছিলি, মন খারাপ হলেই আমায় কল করতে বলেছিলি? সেই কল আমার মোবাইল থেকে যায় না বছরের পর বছর, নিজের এন্ড্রোয়েড মোবাইল হলো, কিন্তু তোকে সাথে ভিডিও কলে কথা হলো না আজ পর্যন্ত।

মনে কি আছে আদো তোর কিছু?

মনে আছে তোর? গেঞ্জি পড়া ছিলি, রাস্তায় বের হয়েছিলাম, বলছিলি শার্ট টা পরে আসি দাঁড়া তাহলে একটু মোটা মোটা লাগবে। কি হাসিটাই না হাসছিলাম।

মনে আছে তোর! নদীর পাড়ে গিয়ে মন খারাপ নিয়ে বসেছিলাম মাটিতে সুপারি গাছের তক্তায়, তুই বসেছিলি পাশে, আস্তে আস্তে এগোতে এগোতে গা ঘেঁষে বসেছিলি! বলেছিলি, কি মন খারাপ?

জানিস এখন আর কাউকে অভিমান দেখাতে পারি না, কারো সাথে ছোট মানুষের মতো করতে পারি না, কিভাবে করবো, কেউ তো জানেই না আমার অভিমান আছে, আমার মন খারাপ আছে। অন্যদের অভিমান এখন আমি নিজেই ভাঙ্গাই, তুই যেখানে ভাঙ্গাতি আমার অভিমান, মন খারাপ।

মনে আছে তোর! পথে আগাইয়া দিতে যেতাম, আমার বাম হাত মুখের কাছে নিয়ে চুমু খেয়ে দিছিলি?

মোবাইলে প্রতিদিন ঘুমানোর আগে আদর দিয়ে ঘুমিয়ে যেতি? মনে কি আছে আদো তোর?

আমি অভিমান করলেই, ও দিইইইইইই ও দিইইইইইই বার্তা, কল দিয়ে মোবাইল ভরিয়ে ফেলতি?

জানিস! তোর ছোটবেলার ছবিটা আমার কাছে এখনো আছে! শুধু ওটাই আছে, আর ওই তোর লেখা স্নেহের টুকরো চিঠিটুকু, আর তোর কাছ থেকে আনা একটা বই। ভয়ংকর যত্নে আছে এগুলো। 

আমিই শুধু আদর খেয়ে গেলাম তোর থেকে কিন্তু আমার কখনো তোকে কপালে স্নেহমাখা আদর দেওয়া হয়নাই। 

আমায় মনে পড়ে এখন আর? ম্যাসেজ করতে ইচ্ছে হয়না? 

আগে তো বাড়ি পৌঁছেই আমায় কল করে জানাতি, বার্তা পাঠাতি।

যাওয়ার সময় জোরে জোরে ডাক দিতি এ দিইই  এ দিইইই, আবার নামের সাথে দিইইইই বলে। আমি মন খারাপে দূরে গিয়ে বসতাম।

তোর মতো আর কেউ ডাকে না জানিস! কেউ না। এখন আর তুইও ডাকিস না। জানিস এখন যে তোকে লিখতেছি আমার চোখ থেকে অঝর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তেছে, আমার খুউব মন পোড়ে তোর জন্য খুউব রে। তুই কি এই মুহূর্তে আমাকে মনে করছিস।

আমার খুউব কেনো জানি কষ্ট হয় প্রতিদিন।

কিছুমাস আগেও তুই কল দিতি আমায়, আমি প্রচন্ড অভিমানে কল ধরতাম না, তারপরে ধরতাম।

এখন আর কলও দিস না। এই দিদিকে কি আর তোর লাগে না এখন? 

আমাকে কি আর কল দিতে ইচ্ছে হয় না একবারও?

আমি তো দেবো না কখনো সেটা তো জানিস, যতদিন পারি।

তোর নতুন নাম্বারটা প্রথমে আমি সেইভ করতাম না অভিমানে। কল দিতি অনেকবার দেখতাম কিন্তু ধরতাম না, এতো অভিমান হতো জানিস না, যখন কল ধরতাম না তখন বলতি আমার কল টল ধরা হয়না কেনো, মোবাইল কোথায় থাকে, মোবাইল কোথায় ছিলো? আমি বলতাম, বাথরুমে ভিজানো থাকে, বাথরুমে ভিজানো ছিলো।

তারপরে অনেকদিন পরে তোর নাম্বার সেইভ করলাম তোর নামের সাথে নাম্বার জানি না লিখে।

আবার আরো একদিন আরো একটা নাম্বার দিয়ে কল দিলি সেটাও আর সেইভ করলাম না।

কষ্ট হতো খুউব, খুব।

আমি একটু বেশি করছি তোর এক্সামের সময়, আমার বোঝা উচিত ছিলো, কিন্তু আমি তো বড় হয়েও ছোট ছিলাম, তাই কথা বলার জন্য কল দিতাম, তোর কাছে মোবাইল থাকে না জেনেও, তুই বলতি বুঝিয়ে তারপরে ও বুঝতাম না, একদিন কথা না বলে কিভাবে থাকবো, সেটাই আমি ভাবতে পারছিলাম না তখন, তাই তো বলেছিলাম তোরে ছাড়া থাকতে পারবো না। আত্মার সাথে কথা না বলে কিভাবে থাকবো সেটাই মেনে নিতে কষ্ট হতো। তাই তুই বুঝানো সত্বেও বুঝতাম না। পরীক্ষা শেষ হলেই তো আবার কথা হবে, সেটাই আমি মেনে নিতে পারছিলাম না, ভালোবাসা পেলে বুঝি মানুষ এতো ছেলেমানুষী করে! 

এরপরে রাগ হয়ে গেলি, রাগ হয়ে কিছু কথা বললি, আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে এমন কিছু কথা, আমি যে কি কষ্ট পেয়েছিলাম তা তুই বুঝবি না, মনে হয়েছিল মরেই যাবো। 

সত্যিই আমার বোঝা উচিত ছিলো, তোর মোবাইল নেই কিভাবে কথা বলবি আমার সাথে, তাহলে ঘরের সবাই তোকে আরো সন্দেহ করবে, যে তুই বোধহয় কথা বলো কোথাও। আমি বুঝিনি রে। স্যরি রে।

তোর পাগল বোনটা বড় হয়েও ছোট হয়ে রইলো।


আচ্ছা এই দু'বছর প্রায়, এখন আর কল দিস না কেনো একবারও, আমি কল ধরি না বলে? কিন্তু আমি তো চাই তুই আমায় প্রতিদিন কল দে, আমি অভিমান করে ধরবো না, মনে মনে ঝগড়া করে অভিমান ঝাড়বো, আবার ধরবো অনেকবার দেওয়ার পরে। কিন্তু এখন দাও না কেনো? 

কিছু মাস আগেও তো বাড়িতে আসলে আমায় জোরে জোরে ডাক দিয়ে বাড়ি যেতি! এ দিইইই, এ দিইইই করে। আমার ডাকে উত্তর দিতাম না, কিন্তু জানিস সব ডাক শুনতাম।

যেই শুনতাম তুই বাড়ি যাবি! আমি ঘর থেকে বের হয়ে যেতাম, মাঠে নাহয় পুকুর পাড়ে। খুউব কষ্ট হতো আর অভিমান। কিন্তু তোর ডাক তো শুনতাম।

কিন্তু এ দুইবার আমায় তো বাড়ি যাওয়ার সময় একবারও ডাকলি না। একবারেও না। খুউব কষ্ট পেয়ে মনের ভুলেও তোকে আর কল দেয়নি! মনের ভুলেও না নিজ থেকে‌।

আমি যে তোকে আমার সকল ভালোবাসা দিয়ে বানানো উপহার টা দিয়েছিলাম, সেটা কি তোর একটুও ধরে বেঁধে রাখতে মন চায়নি? আমি কি আসলেই তোর ভালো বোন হতে পারিনি!

জানিস দেখলাম যেদিন উপহারটা অন্য কারো কাছে, একটা অট্টহাসি দিয়েছিলাম, হো হো করে! কিভাবে দিয়ে দিলি তুই? একটুও জোর করতে রাখতে পারলি না! একটুও কি রাখতে মন চাইনি কাছে! আমি তো ভুলভাল উপহার দেয়নি, নিজের হাতে বানানো প্রিয় প্রাণটাকেই বানিয়ে দিয়েছিলাম নিজের হাতে। সেটা তুই দিয়ে দিলি তাইনা! কেনো জানি মন খারাপ হয়নি, হাসতে ছিলাম আর বুকটা চিনচিন ব্যাথা করছিলো, আর কিছুই না। বুকটা হৃদস্পন্দন থেমে গেছিলো, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল বুকের ভিতরে খা খা করছিল, জীবনে নিজের হাতে বানানো জিনিস কাউকে দেয়নি, শুধু তোকে দিয়েছিলাম। কিন্তু তুই নিজের কাছে রাখলি না। 

তোর মনে আছে? নদীর পাড়ে স্নান করতে গেছিলি!

ঘাটে এসে মাটি মাখা পা দুটো জালকাটা দিয়ে ঘষে দিছিলাম! তোর কিছুই কি মনে আছে?

মনে আছে তোর? একসাথে বসে গল্প করতাম?

চৌকিতে বসে গল্প করছিলাম, যখন কি কি জানি নিয়ে কথা হলো, হুট করে রাগ হয়ে আমি রাগ করে ঘাটে নেমে বসেছিলাম, গিয়ে রাগ ভাঙ্গাইছিলি?

মনে পড়ে তোর? তোদের বাড়ি গেছিলাম! রাতে আমায় নিয়ে হেঁটে রাস্তায় গেছিলি! আমি আকাশের দিকে চাওয়াতে বলেছিলি, কি মন খারাপ লাগে?

দেখ ওই যে চাঁদ দেখা যায়?

মনে পড়ে তোর? কামড়ানো ছাড়া আঙ্গুর খাবো না দেখে, চলে এসেছিলাম রুমে, রাগ ভাঙাতে বার্তা করতে ছিলি! কামড়ে কামড়ে অর্ধেক অর্ধেক করে বাটিতে রাখছিলি?

মনে কি আছে তোর কিছু?

মনে পড়ে তোর! নতুন মোবাইল কিনে আমায় এসে বলেছিলি, এ দেখ নতুন ফোন কিনেছি। না ধরাতে বলেছিলি, ধর! ধরে একটু দেখেই আবার দিয়ে দিছিলাম।

এ দিকে তাকা তো একটা ছবি তুলি, আমি তুলি নাই একটা ছবিও।

তুই এতো আদর করতি কিন্তু আমি কিন্তু তোকে কখনো আদর খাই নাই। এমনকি মাথায়ও চুমু খেয়ে দেয়নি। আমি তোর কাছে ছোটদের মতো ছিলাম, সব করতি তুই। রাগ হতাম, অভিমান করতাম আমি। আর তুই সব ভাঙ্গাতি।

সত্যিই তোর মতো মায়ামাখা ডাক আমি কারো কাছ থেকে পাই না রে। 

কত মানুষই তো দিদি বলে ডাকে কিন্তু তোর মতো করে ডাকে না রে।

সময় হয়না তোর আর আমায় একটা কল দেওয়ার, ওইদিকে তো সবাইকেই কল দেও শুনি। আমাকে আর দাও না।

বেশি করে মনে পড়ে সবসময় বেশি করে। তোর পড়ে না? তোর দিদিটাকে তোর কি পড়ে না মনে একবারও?

মনে আছে তোর ঠাকুর ঘরে সন্ধ্যা দিতে গেলে, আমার পাশে গিয়ে বসছিলি!

এখন আর ভালোবাসা যায় না আমায়?

এ দিইই দেখ ওই চাঁদ উঠেছে বলা যায় না,?

এ দিইই এ দিইইই বলে বার্তা পাঠানো যায়না?

জানিস তোকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারতাম, তাহলে সকল কষ্ট হয়তো ফুরিয়ে যেতো।।

আমি তোকে সারাদিন ডাকি, সারাদিন, কিন্তু তোর সাড়া পাইনা।

জানিস, সেই মায়ের পুরোনো মোবাইলটা বের করে রাখলাম সেদিন, কত হাজার হাজার বার্তাই না আসতো আর যেতো এই ফোনে।

শোন জীবনে কোনো ভাই পাইনাই, তোকে পেয়েছিলাম, যে আমার অভিমান ভাঙ্গাতো।

সারাজীবন এই চাপা কষ্ট বয়ে বেরাতে হবে। 

চাপা কষ্টে একদিন হার্ট অ্যাটাক, বা স্ট্রোক হবে আমার।

তুই ফিরে আয়, আমায় আবার ডাক, আমায় ম্যাসেজ কর। আমি আর অভিমান করে বসবো না, ম্যাসেজ করলেই উত্তর দিবো, কল দিলেই কল ধরবো। তুই আমায় কল দে, ম্যাসেজ কর, প্রতিটি রাত দিন সবখানে তুই‌। 

আমি কি লিখবো তোকে তা বুঝে উঠতে পারছি না।

এই? শোনিস না আমার কথা! 

ইতি তোর দিইই।



Reviews


Your Rating

blank-star-rating

Left Menu