বইয়ের বিবরণে ফিরে যান প্রতিবেদন পর্যালোচনা

খোঁজ (পর্ব-২১)

তির্য্যক হিথ্রো বিমানবন্দরে নেমে যেই ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পৌঁছোলো, দেখলো পুলিশ ওয়ারেন্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওকে গ্রেপ্তার করার জন্যে। পুলিশ ওকে নিয়ে গেলো লাগেজ-ক্যারৌসেলের কাছে; সেখান থেকে ওর মাল নেবার পরে ওকে নিয়ে গেলো পুলিশ-স্টেশনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে।

তির্য্যক ওর স্ত্রী অশনির সঙ্গে কথা ব’লতে চাওয়ায় পুলিশের উত্তর এলো, ‘অশনির কথা তুমি কী ভেবে জিগ্যেস ক’রছো? লণ্ডন ছাড়ার আগে তুমি কি ওকে জীবন্ত অবস্থায় রেখে গেছিলে?’

‘আপনি কী ব'লতে চান? অশনি ঘুম থেকে দেরীতে ওঠে রোজ। আমি সকাল সাড়ে পাঁচটায় বাড়ী ছেড়েছি, কারণ চেক-ইন শুরু  হ’য়েছে সকাল ছ-টা থেকে। ও বিছানাতেই ছিল; আমি ওকে জাগাইনি; আমি রেডী হ’য়ে মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে যাই, দরজাটা টেনে বন্ধ ক’রে দিই; ওর কাছে চাবি আছে, ভেতর থেকে খুলতে কোনো অসুবিধে নেই।‘

‘প্লীজ, কোনো কথা বলার আগে আপনার উকিলের পরামর্শ নিয়ে ব’লুন। আপনি যা ব’লবেন সব রেকর্ড ক’রে রাখা হবে; এগুলো আপনার বিরুদ্ধেও যেতে পারে।‘ পুলিশ অফিসারটি ব’ললো, ‘অশনি বিছানায় ছিল ঠিকই, কিন্তু ওর হাতদুটো বাঁধা ছিল দড়ি দিয়ে, পাদুটোও। সবচেয়ে বড় কথা তার গলায় দেওয়া ছিল দড়ির ফাঁস।‘

‘ওকে পাওয়া গেল কি করে? কে ঢুকলো দরজা খুলে?’ তির্য্যক জিগ্যেস ক’রলো।

‘ওর স্বামী, ভীষণ, বাঁচিয়েছে ওকে। ভীষণ বাড়ী ফিরেছে সকাল  সাতটায় হোটেলে নাইট শিফ্ট করার পর। ও অশনিকে দেখেছে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকতে; সঙ্গে সঙ্গে ও পুলিশকে রিপোর্ট করেছে। অশনির জবানবন্দী অনুযায়ী তুমি ওর উপর নির্য্যাতন করেছো, তারপর বিছানায় ওকে ফেলে ওর হাত, পা আর ঘাড় দড়ি দিয়ে বেঁধেছো জম্বেশ করে।‘

তির্য্যককে গ্রেপ্তার করা হ’লো কোনো জামীনের সুযোগ না দিয়ে; ওকে সুযোগ দেওয়া হ’লো ওর পছন্দমতো উকিলকে নিয়োগ করার জন্যে; কিন্তু উকিল খুব একটা সুবিধে ক’রতে পারেনি, কারণ ভীষণ আর অশনি আইনতঃ বিবাহিত লণ্ডনের ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট অনুযায়ী। ভারতীয় প্রথা অনুযায়ী, তির্য্যক আর অশনি বিবাহিত একথা প্রমাণ করা গেল না।

ভীষণ-অশনির বিরুদ্ধে মামলাটিতে হেরে গেলো তির্য্যক; অশনির স্বামী হিসেবে তির্য্যক ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যে থাকার ও কাজ করার ভিসা পেয়েছিল;  সে ভিসাও বাতিল হ’য়ে গেল; তির্য্যককে লণ্ডন ছেড়ে ভারতে ফিরে যেতে বাধ্য ক’রা হ’লো। তির্য্যকের বাড়ী, ব্যাঙ্কে বা বাইরে যা কিছু সম্পত্তি ছিল সবই অশনির সঙ্গে যৌথ মালিকানায় ছিল; তির্য্যকের এক মাসের অনুপস্থিতির সময় সবই অশনির একার নামে ক’রে নেওয়া হ’য়েছে। তির্য্যক ভারতবর্ষে ফিরলো হতাশ হ’য়ে, নিঃস্ব হ’য়ে। ওর লণ্ডনে মেটালার্জিস্ট হ’য়ে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হ’লো কেবল লণ্ডনে ওর বৈবাহিক অবস্থার জন্যে। পিনাকী ভাবলো যদি ইউ-কে অর্থাৎ ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য আর ভারতবর্ষ এক দেশ হ’তো, তবে অশনি দ্বিতীয়বার বিয়ে ক’রতে পারতো না, হ’তো না তির্য্যকের এই দুরবস্থা।

তির্য্যক ভারতবর্ষে চাকরী পেয়েছিল, কিন্তু তেমন ভালো মাইনের নয়। তারপর ও কানাডায় থাকার জন্যে দরখাস্ত পাঠায় আর দশ মাসের মধ্যে  ভিসা পেয়ে যায়। কানাডায় আসার আগে আত্মীয় বন্ধুবান্ধবেরা মিলে তির্য্যকের বিয়ে দিলো রিমির সঙ্গে। অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে রিমি, কমার্স গ্র্যাজুয়েট; বিয়ের আগে কাজ ক’রছিল এক গভর্নমেন্ট আণ্ডারটেকিং-এ। তির্য্যক ভিসার ব্যবস্থা ক’রলো রিমির জন্যে; দুজনে একসঙ্গে এলো কানাডায়। কানাডার মতো দেশে এসে খুশী হ’লো রিমি, কিন্তু তির্য্যকের অতীত সম্পর্কে কোনো ধারণাই ক’রতে পারলো না ও। ও ভুলে যাচ্ছিল যে ভারতে ও স্বাবলম্বিনী ছিল, এখানে ওর পরিচয় তির্য্যকের সুন্দরী বৌ।

 

বিক্রম আর তনুজার বিদ্যেবুদ্ধি ছিল অন্ততঃ স্নাতক পর্য্যায়ের, কালচারের আলো ঠেকরাতো ওদের কথাবার্তায়; গল্প বলায়, আবৃত্তিতে, নাটকের বিভিন্ন ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় ক’রতো ওরা; যেমন কথা ব’লতো, তেমনই লিখতো আর ছবি আঁকতো। ওরা নিজেরাই ওদের বিয়ের ঠিক ক’রে বাবা-মার অনুমতি নিয়েছিলো। প্রণতির আর পিনাকীর সঙ্গে প্রথম যখন ওদের দেখা হয়, তখন ওরা দুজনেই কাজ খুঁজছিল আর আই-টিতে ট্রেনিং নিচ্ছিল; এর আগে বিক্রম শিক্ষকতার কাজ ক’রেছে সাউথ আমেরিকায় আর লণ্ডনে। 

 

বিক্রম আর তনুজা ভারতবর্ষের বংশোদ্ভূত কয়েকটি পরিবারকে নিয়ে একসঙ্গে দল বেঁধে ছুটি কাটাবার আয়োজন ক’রলো; অংশ গ্রহণ ক’রলো ছয়টি পরিবার- দাসদা-পার্ব্বণী, চঞ্চল-চামেলী, বিক্রম-তনুজা, অ্যাস্টন-জ্যানেট, তির্য্যক-রিমি, প্রণতি আর পিনাকী। দল বেঁধে ছুটি কাটানোর খরচ এই ছয়টি পরিবারের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে এই ঠিক হ’লো। “নিরালা” নামে এক ছয় বেডরুমের একতলা বাড়ী ভাড়া করা হ’লো শুক্রবার-শনিবার দুই রাত্রির জন্যে। সারি বেঁধে ছয়খানি ঘর,  প্রতিটি ঘরের সামনে একটা দরজা ঘরে ঢোকার জন্যে, আরো দরজা আছে দুপাশের ঘরে যাবার জন্যে। সামনে একটা বড় উঠান আর পেছনে একটা বড় বাগান। চাল-ডাল, শাক-সব্জী, মাছ-মাংস ইত্যাদি কিনে এনেছে দাসদা-পার্ব্বণী, বাকী পরিবারগুলির যারা যে রান্না ভাল ক’রতে পারে তারা সেই রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে এসেছে। দাসদা-পার্ব্বণী ছাড়া প্রতিটি পরিবার তাদের নিজেদের গাড়ী নিয়ে এসেছে। প্রথম দিন শেষ হবার পরে সন্ধ্যার অন্ধকারে সবাই বাগানে, তনুজা শুরু ক’রলো ভূতের গল্প বলা।

একটা বটগাছের ঝুরি ধরে কিভাবে নামছিল ভূতটা তার বর্ণনা দিচ্ছিল তনুজা, এমন সময় শোনা গেলো কারুর দ্রুত নিঃশ্বাস পড়ার শব্দ আর নাকী সুরের ফিসফিসানি। বাগানের অন্ধকারে এগিয়ে আসছে একটি ছায়ামূর্ত্তি, দুটি হাত প্রসারিত দুইধারে। কাঁপুনি দিল সকলের গায়ে; শুরু হ’লো হৃৎকম্প; হতভম্ব তনুজা, থামালো তার গল্প; গল্পের ভূত যে এভাবে আবির্ভূত হবে এ তার কল্পনার বাইরে। চামেলী ঝাঁপিয়ে পড়ে কারুর গলা জড়িয়ে শিশুর মত বুকে চেপে ধরলো।

যখন দলের সবাই, এমনকি গল্পের বক্তা তনুজাও ভয়-বিহ্বল মুখে ভূতের দিকে তাকিয়ে, তখন ভূতই কথা ব’লে উঠলো,  ‘কী হ’লো তোমাদের সব? আমি আইসক্রিম খুঁজছিলাম; আছে তোমাদের কাছে?’,  কথা ব’লছে তির্য্যক, ও এইমাত্র নেমে এসেছে বাড়ীর চাতাল থেকে।

এখন সবাই আশ্বস্ত, সামনে তির্য্যক আবির্ভূত, গল্পের ভূত তিরোহিত; চামেলীর বজ্র আঁটুনি থেকে বিক্রম হ’লো মুক্ত। হতবুদ্ধি চামেলী ব’ললো, ‘সরী, বিক্রম, একটু জল নিয়ে আসছি।‘

বিক্রমের শার্ট দলা-মোচড়ানো, ভিজে গেছে চোখের জলে আর মুখের লালায়, তার সঙ্গে খাপছা খাপছা লিপস্টিকের দাগ।

‘ফ্রীজে আইসক্রীম আছে।‘, পার্ব্বণী ব;ললো, ‘চলো প্রণতি, আমরা আইসক্রীম নিয়ে আসি এখানে।‘

******     

এক শনিবারে অ্যাস্টন-জ্যানেট-ফুলকি, চঞ্চল-চামেলী-বাবু আর দাসদা-পার্ব্বণী বেরিয়ে পড়লাম লায়ন সাফারি পার্ক দেখতে। অ্যাস্টন, জ্যানেট আর ফুলকি অ্যাস্টনের গাড়ীতে; বাকী সবাই চঞ্চলের গাড়ীতে।

দুপুর ঠিক একটার সময় এক ডজন গাড়ী ঢুকলো সাফারি পার্কে; তখন সেখানে সিংহেরা বিচরণ ক’রছে, বাঁধনছাড়া। ছয়টি সিংহের মধ্যাহ্নভোজের জন্যে সেখানে ছুঁড়ে দেওয়া হ’লো কুড়িটি জীবন্ত প্রাণীকে, কিছু ভেড়া আর কিছু হরিণ ছিল এর মধ্যে। সিংহেরা এদের তাড়া করে ধ’রবে, তারপর থাবা দিয়ে ধরে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে। সাফারি পার্কের মধ্যে গাড়ীর যাত্রীরা দেখবে জীবন্ত ভেড়া আর হরিণ দিয়ে সিংহদের মধ্যাহ্নভোজ।

পর্যালোচনা


আপনার রেটিং

blank-star-rating

বামদিকের মেনু