অধ্যায় 2
#মুখোশ
দৃশ্য_২য়
পার্টিতে ঋত্বিক নয় নয় করে ৭/৮ পেগ খেয়ে নিয়েছিল। তাই ডিনারে বিশেষ কিছুই খেলো না । সাথীও নিজের কাজ সেরে ফ্রেশ হয়ে বেডরুমে এসে দেখে ঋত্বিক বিছানায় নেই । মনে মনে ভাবে বেডরুমেই তো ঢুকতে দেখলাম , আবার কোথায় গেল। ড্রইং রুমের দিকে উঁকি দিয়ে দেখল সেখানে আলো জ্বলছে । ঘরে ঢুকতেই চমকে উঠেছে সাথী । ইসস ! কি অবস্থা চারিদিকে কুশন ছড়িয়ে আছে ঘরের মাঝে কার্পেটটা সকলের পায়ে পায়ে বিশ্রী ভাবে কুঁচকে পড়ে আছে, অ্যাস্ট্রে দুটো ছাইয়ের স্তূপে ভর্তি । ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকা চিপসগুলো ঘন্টাখানেক আগেও এই ঘরে হই হুল্লোড়ের সাক্ষী দিচ্ছে । যেনো ছোটো খাটো সুনামী বয়ে গেছে । তার মধ্যেই একটা কুশান নিয়ে ঋত্বিক পরম শান্তিতে শুয়ে আছে সোফার ওপর, পা গুলো সোফার হ্যান্ডেলের ওপর । মনে মনে ভাবে এই কারনেই রাকেশদারা নিজেদের বাড়িতে পার্টিটা রাখেনি । সকলেই জানে , পার্টির আগের প্রস্তুতির চেয়ে আফটার এফেক্ট সামলানো অনেক বেশি কষ্টকর । ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সাথী ঋত্বিকের গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে যাবে বলে হাতটা বাড়িয়েছে, তখনই খেয়াল পরলো ঋত্বিক দুহাত দিয়ে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে আছে অরুণাচল থেকে আনা ঐ মুখশটাকে ।
----" কি অদ্ভুত ছেলে রে বাবা, মুখোশের একি নেশা ?
একটু বিরক্ত হয়েই মুখশটা হাতের বন্ধন মুক্ত করে দেওয়ালে টাঙিয়ে দেয় সাথী । বারকয়েক ঋত্বিককে ডাকাডাকি করলেও কোন সাড়া মিলল না । বাধ্য হয়েই বেডরুম থেকে একটা চাদর এনে পা থেকে বুক পর্যন্ত ঢেকে দিল ঋত্বিকের । আর নাইট ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে সাথী বেডরুমের দিকে পা বাড়ায় । একটু আগেই একটা সাওয়ার নিয়েছে তাই আজ আর এসি চালাতে ইচ্ছা করছে না । তাছাড়া ভোর বেলা বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া দেয় । বেডরুমের সবকটা জানলা খুলে পর্দাগুলোও সরিয়ে দিলো । ফ্যান চালিয়ে চাদর ঢাকা দিয়ে শোবার বদ অভ্যাস সাথীর । আজও তাই করলো । ফাঁকা বিছানার ঋত্বিকের অংশটায় হাত বোলাতে বোলাতে ভাবে , ---- এতো ড্রিংকস নেওয়ার কি দরকার যখন সেটা খেয়ে হুশ থাকে না । ঋত্বিকের এই স্বভাবটা ভালো লাগেনা ওর । সাথীর যুক্তি অল্প খাও, আনন্দ করো, উপভোগ করো সেই নেশাটাকে। সারাটা দিন প্রচুর ধকল গেছে , ভালোই করেছে কাল ঋত্বিক ছুটি নিয়েছে । ওর তো এমনিতেই কাল ছুটি । সকাল সকাল ওঠার কোন ঝামেলা নেই .....। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ক্লান্ত শরীরটা ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে সাথীর খেয়াল নেই।
******************
দৃশ্য_৩য়
পরদিন সকাল ৯.৩০। ঘুম ভাঙ্গে কলিং বেলের আওয়াজে । চোখগুলো যেন খুলতেই পারছে না , জ্বলছে , মনে হচ্ছে আরও একটু ঘুমোলে ভালো হয় কিন্তু দরজায় এখন আবার কে এলো ? যা হোক করে বিছানা থেকে নেমে স্লিপারি দুটো পায়ে গলিয়ে, ঘষতে ঘষতে এগিয়ে যায় দরজার দিকে সাথী । দরজা খুলে দেখে মালতি দি । মনে মনে ভাবে, কোনদিন সাত সকালে আসবে , আবার কোনদিন ভর দুপুরে । সব সময় নিজেদের সুবিধা মতো । তবে একদিকে ভালোই করেছে এত বাসন জমে আছে, ঘরের যা অবস্থা মালতিদি না আসলে কি যে হতো । তাই মনে মনে অনেক কিছু ভাবলেও মুখে কিছু বলল না । বরং দরজা বন্ধ করে এগিয়ে গেলো ড্রয়িং রুমের দিকে । ঋত্বিক তখনও দিব্যি ঘুমাচ্ছে। দু তিনবার ডাকার পর ঋত্বিকের ঘুম ভাঙ্গে । অনেক কষ্টে চোখ খুলে ঘড়ির দিকে তাকাতেই মেজাজটা চটকে গেলো । ইচ্ছে ছিলো আরও একটু ঘুমাবে কিন্তু কোথায় কি ।
---- "আরে সাড়ে নটা বাজতে চলল ডাকোনি কেনো ? কত দেরি হয়ে গেল ? " মোবাইলটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনটা অন করতেই ঋত্বিক দেখে গোটা পাঁচ বার মায়ের মিসড কল ।
----" এতো সকালে মা ফোন করেছে তাও পাঁচ বার । দেখি কি হলো " বলে স্পিড ডায়াল থেকে কল করে মাকে ।
----"ফোন করেছিলে ? কি হয়েছে বল?
কথা সেরে ফোনটা সোফায় রেখে বেজার মুখে সাথীর দিকে তাকিয়ে বলে...
-----" কোথায় ভাবলাম আজকে একটু শুয়ে বসে কাটিয়ে দেবো , তা না এসব ঝঞ্ঝাট ।
-----"কেন কি হল ? কি বলছেন মা ?
-----" সকলে মিলে আজকে দক্ষিণেশ্বর যাবে পুজো দিতে , বছরের প্রথম দিনটা নাকি খুব ভালো দিন মায়ের কাছে পুজো দেওয়ার । আগে থেকে কিছু প্ল্যান করতে পারে না । কালকে যখন ফোন করলাম কিচ্ছু বলল না , অথচ আজ সকাল বেলা হঠাৎ করে নাকি মন টানছে । দুর ...। " বিরক্তি মাখা সুরে কথা গুলো বলে ঋত্বিক ।
----" কখন যেতে হবে ?
---- ১১ টার মধ্যে বেরোবো , কিবলো ? আর হ্যাঁ , তুমি মালতিদিকে বলো সেইরকম রান্না করতে । পুজো দিয়ে সকলে এখানেই আসবে । হৃশিতা আর মনোজিৎদাও আসছে । "
মাথা নেড়ে সায় দেয় সাথী ।
কথাগুলো বলেই বেরিয়েই যাচ্ছিল ঋত্বিক । হঠাৎ কি মনে হতে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল ,
----- "হ্যাপি নিউ ইয়ার সাথী । "
----- "সেম টু ইউ ডার্লিং ।"
ঋত্বিক এগিয়ে যায় বাথরুমের দিকে আর সাথী রান্নাঘরের দিকে ।
*****************
দৃশ্য_৪র্থ
একটা ওলা বুক করে সাড়ে দশটা নাগাদ রওনা দেয় দুজনে । চিনার পার্ক থেকে বেশি সময় লাগার কথা নয় । সাথী একটা অরেঞ্জ সাদায় মেশানো সিল্ক গাদোয়াল আর ঋত্বিক জিন্স টি-শার্ট পড়েছে ।
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর সাথীই জিজ্ঞাসা করে....
---- "কাল তুমি ড্রয়িং রুমে শুয়ে পড়লে কেনো ? আর ঐ মুখোশটাই বা হাতে নিয়ে কি করছিলে ?"
সাথীর কথায় মনে পড়ে যায় কাল রাতের সব ঘটনা । আজ ঘুম থেকে উঠে একদম মাথাতেই আসেনি । সত্যিই তো কাল কিসব হচ্ছিলো ওর সাথে , সকলের না বলা কথা শুনতে পাচ্ছিলাম । মনে মনে ভাবে হয়তো ওভার ডোজ হয়ে গেছিলো তাই নেশাটাও চড়ে গেছিলো তাই হয়তো । ঠিক আছে দেখি না আর কিছু হয় কিনা । তাহলেই বুঝতে পারবো কেসটা কি ।
-----"কি হলো বললে না তো কিছু ?"
----- "কি বলবো বলো , হাতে নিয়ে দেখছিলাম , জানোই তো একটু বেশি হয়ে গেছিলো কাল । মাথার ঠিক ছিলো না ।" এসব বলে সাথীর থেকে আপাতত টপিকটা ঘোরালো ।
সাথী জানলার দিকে চোখ রাখে । আজ বছরের প্রথম দিন হওয়ায় রাস্তা ঘাট ফাঁকা, অফিস যাত্রীও অপেক্ষাকৃত কমই চোখে পড়লো । তবে ইয়ং কাপল আজ সে তুলনায় একটু বেশিই দেখলো । বিশেষ করে বিকট শব্দধারী বাইকে চড়ে, চালকের পিঠে শরীর লেপ্টে দিয়ে, বেশ কয়েক জোড়া ছেলেমেয়ে চোখে পড়লো ।
আধা ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যায় মন্দিরে । ততক্ষনে ওরা সকলেই এসে গাড়ি পার্কিং করে ডিপোজিট কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো । বছরের প্রথম দিন, তার ওপর পুজো উপলক্ষে সকলেই বেশ পরিচিত বাঙালি সাজে এসেছে আজ । সঙ্গে আনা ব্যাগ মোবাইল জমা দিয়ে এগিয়ে যায় ডালা সংগ্রহ করতে । পছন্দমতো ডালা নিয়ে ঢুকে পড়ে মন্দির প্রাঙ্গণে ।
আজ নিউ ইয়ার তার উপর কল্পতরু উপলক্ষে মন্দিরে ভিড় উপছে পড়ছে । টানা এক ঘণ্টা দীর্ঘ লাইন অতিক্রম করে পৌঁছায় মূল মন্দিরে । তবে চারিপাশে দন্ডায়মান অসংখ্য মানুষের ভিড়ে ঋত্বিকের অভিজ্ঞতা ছিলো মনে রাখার মতো । সব মানুষের মুখের আড়ালেও যে আর একটা মুখ থাকে তা বোধ হয় এখানে না এলে জানতেই পারতো না । কালকের ঘটনার পুনরাবৃত্তির সাক্ষী রইল ঋত্বিক আজও ।
চুপচাপ নিজের মনে দাঁড়িয়ে ছিল ঋত্বিক, হঠাৎই কানে এলো ----
-----" এখনও এত্তো লাইন , তাহলে পুজো দিতে বেশ দেরি হবে মনে হচ্ছে , ঠিক আছে, বাড়ি যেতেও দেরি হবে তাহলে । না হলে বাড়ি গিয়ে আবার গুষ্টির গেলার ব্যবস্থা করতে হবে । ছোট বউটা পোয়াতি বলে কুটোটা নাড়বে না গো । এতো বড় সংসার সব আমার ঘাড়ে ।"
কথাগুলো শুনে এপাশ ওপাশ তাকাতেই চোখে পড়লো ওর ঠিক আগেই দন্ডায়মান এক হলুদ শাড়ি পড়া চল্লিশ উর্ধ্ব মহিলাকে ।
মহিলার ঠোঁট কি নড়লো নাকি কালকের মতই মনের কথাই শুনলো ঋত্বিক ? এসব ভাবতে ভাবতেই আবারও কানে এলো এক মহিলা কন্ঠস্বর । ঋত্বিকের ঠিক পাশেই সমান্তরাল ভাবে চলা লাইনে আছে একজোড়া অবিবাহিতা অল্প বয়সি ছেলে মেয়ে । হ্যাঁ ঠিকই শুনেছে এই মেয়েটিই হাত জোড় করে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে মনে মনে বলছে ----- " এই ভাবে আর কতদিন ঠাকুর । বিয়ে নিয়ে প্রতিদিন বাড়িতে অশান্তি করছে বাবা , আর ক'দিন ঠেকাবো আমিও জানিনা । একটা চাকরি জয়ন্তকে পাইয়ে দাও । না হলে আমায় অন্য পথ বাছতে হবে যে ।"
এখন স্পষ্ট দেখেছে মেয়েটার মুখ বন্ধ । তবু শুনতে পেলো কথা । ঠিক কাল রাতের মত । তাহলে কাল রাতে যা যা হচ্ছিল তা মোটেই নেশার ঘোরে নয় । কিন্তু কিভাবে এটা সম্ভব ? ঠিক তখনই আরও একটা পুরুষ কন্ঠস্বর কানে এলো ওর । ---- " উফফফ কি মাল মাইরি । পুরো আইটেম মাল । কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবো । এতবড় ছেলের মা কিন্তু শরীরটা যেনো ঠিক একুশ পেরোনো । আর আমার কপালে জুটেছে একটা শুকনো রুটি , সামনে পিছনে কোনো দিকেই কিছু নেই । ঠাকুর একটু মুখ তুলে চাও । " কথাগুলো বলে মেয়েটার পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা এক ঝলকে মেয়েটার শরীরটাকে জরিপ করে নিয়ে আবার অন্যদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।
ছেলেটার কথাগুলো শুনে ঋত্বিক হাসবে না মেয়েটার জন্য দুঃখ করবে ভেবে পেলো না । তবে মানুষ যে এইভাবে রং বদলায়, তা গিরগিটিকেও হার মানিয়ে দেবে ভেবে মনে মনে এক প্রকার কষ্টই পেলো ঋত্বিক ।
ওদিকে মা , বোন আর সাথী তো পুরো দমে গল্প করে যাচ্ছে সংসার , বেড়ানো, অফিস নিয়ে । বাবা আর মনোজিৎদা নিজেদের ব্যাপার নিয়ে মানে ঐ দোকান, কর্মচারী , লাভ লোকশান নিয়ে ।
ঠিক তখনই ঋত্বিকের একেবারে কানের কাছে যেনো কেউ ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো ---- " মা ইসবার উও টেন্ডার মুঝে দিলাদো , সালা মিনিস্টার কো ইতনা খিলায়া , ফিরভি বোলতা হ্যাঁ অ্যাম নট সিউর, বেইমান সালা কাহিকা । কালী মা ইসবার নিরাশ মাত কারনা।"
কথাগুলো শুনেই পিছন ফিরে দেখে এক অবাঙালি সাদা পাঞ্জাবি আর ধুতি পরিহিত স্থূল বপুধারী ব্যক্তি দন্ডায়মান, কপালে তিলক অঙ্কিত আর মুখ ভর্তি পানমশলায় । ঠোঁটের কষ দিয়েও কিছুটা বেরিয়ে এসেছে । ঋত্বিককে পিছন ফিরতে দেখে মশলা ভর্তি মুখেই ফিক করে হেসে দিলেন । ভদ্রলোককে একপলকে দেখে নিয়ে ঋত্বিক মনে মনে ভাবে----- " এরা কারা ? মায়ের মন্দিরে এসেও অর্থ স্বার্থ । "
এদিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে তাকাতেই চোখে পরে কতকগুলো বাচ্চা নিয়ে এক ফ্যামিলি ম্যান দাঁড়িয়ে আছে । শরীরের মধ্যপ্রদেশ থেকে বাড়ন্ত ও ঝুলন্ত ভুঁড়িকে বেল্ট দিয়ে আটকে রাখার চেষ্টা আর সঙ্গে আনা মেয়ে তিনটেকে দেখে সেটা স্পষ্ট । মা ব্যতিব্যস্ত হয়ে মেয়েগুলোকে সামলাচ্ছেন । মেয়েগুলোর উচ্চতা দেখেই বয়স আন্দাজ করা যাচ্ছে । ঠিক যেনো বড় থেকে ছোটো সাজানোর মতো । হঠাৎ শুনতে পায় লোকটা হাত জোড় করে বিড়বিড় করে বলছে , মা এবারেরটা যেনো ছেলে হয়, মা । নাহলে বংশে বাতি দেবার কেউ নেই মা , মাগো মা দেখো একটু ।
কথাগুলো শুনে ঋত্বিক একবার ঐ বৌটার দিকে তাকিয়ে দেখলো । এসব শুনে হাসি পায় ওর । বেশ মজার ব্যাপার তো । সব মানুষের মনের না বলা কথা গুলো শুনতে পাচ্ছে । ভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা ।
ওদিকে ওদের লাইনও প্রায় এগিয়ে এসেছে ঠিক মূল মন্দিরের সামনে । এতো কোলাহল হইচই এর মধ্যেই শুনতে পেলো এক মহিলার গলা ---- " মাগো তোমার আশীর্বাদি ফুলটুকুই একটু নেবো । ওরা কি দেবে মা ? আমার যে ডালা কেনারও সামর্থ নেই মা । ছেলেটার বড্ড শরীর খারাপ । ওষুধ কেনার টাকায় ডালা কিনতে আমি পারলাম না মা । মুখ তুলে চাও মা , ছেলেটাকে সুস্থ করো ।" চোখের কোনো এসে যাওয়া জলটা সকলের অলক্ষ্যে মুছে নিলো সেই নীল কালো তাঁতের শাড়ি পরিহিতা মহিলা ।
এসব শুনতে শুনতেই ঋত্বিকও বাকিদের সাথে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল মূলমন্দিরের চাতালের দিকে ।আর জনা পাঁচেক লোক পরেই ওদের পালা । ভিড়ের মধ্যে শুধু মাথাগুলোই দেখা যাচ্ছে ।
ডালাগুলো পুরোহিতদের হাতে দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আবার রিটার্ন চলে আসছে মায়ের আশীর্বাদি ফুল সহ । আর ঋত্বিকরাও চটপট প্রনাম সেরে মাকে দর্শন করে মনের কথা জানিয়ে বড় করে একটা প্রনাম করে নিচ্ছি কপালে হাত জোড় করে । আর অজস্র লোকের মনে মনে মায়ের উদ্দেশ্যে বলা কথাগুলো মন্ত্র পড়ার মতোই সমস্বরে শুনতে পাচ্ছিলো । ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন ভেসে ঋত্বিকের কানে এলো ---- আহা কি মুশকিল, প্রণামি বক্সে কেনো ফেলছো টাকা গুলো , পাশে এতো বড়ো রেকাব আছে সেখানে দাও না বাছারা ।
মনে মনে খানিক চমকে উঠলো ঋত্বিক । এতোক্ষণ যা শুনছিলো হাসি ঠাট্টা মনে হচ্ছিল কিন্তু এটা কি শুনলো । তবে ভিড়ের ঠেলায় বেশিক্ষণ দাঁড়াতে না পেরে নেমে আসে সিঁড়ি দিয়ে । শীতের আগমনে এই ভর দুপুরের রোদটাও বেশ লাগছে । ঋত্বিক শিবমন্দিরের একটার সিঁড়িতে উঠে বসলো আর বাকিরা সকলেই ১২টা শিব মন্দির ঘুরতে গেলো । সাথীও গেলো ।
আর কোনো কিছু ভাবতেই ইচ্ছা করছে না ওর। মানুষের মধ্যে মানবিকতা , মনুষত্ব বোধ সব কি হারিয়ে যাচ্ছে , সবই কি টাকার খেলা । মায়ের আশীর্বাদ পেতে গেলে অর্থ লাগবেই । কেনো ? মা কি অর্থের বিনিময়ে তার সন্তানকে আশীর্বাদ করে নাকি মায়ের কাছে ভক্তের ভক্তির তুল্যমূল্য অর্থ । সবই সিন্ডিকেট আর মিডলম্যানদের খেলা । মনটা বেশ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল এসব দেখে শুনে । হঠাৎই দেখে একটা বছর দেড়েকের বাচ্ছা ছেলেকে নিয়ে এসে বসল দুজন । বয়স দেখে মনে হলো একজন বাবা একজন দাদু । বাচ্চাটা সবে টলমল পায়ে হাঁটতে শিখেছে । একবার বাবার কাছে আসছে তো পরক্ষণেই আবার টলতে টলতে পা ফেলে দাদুর দিকে যাচ্ছে । এতো সব মন্দের মধ্যেও যেনো এই নিস্পাপ শিশুটা একমুঠো ভালোলাগা মিশিয়ে দিলো । খানিক বাদেই শিশুটির মা পুজোর ডালা নিয়ে এসে ছেলের বুকে কপালে ফুল ছুঁইয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলে এক চিমটি প্রসাদ মুখে দিয়ে দিলো শিশুটির ।
ওদের থেকে চোখটা সরিয়ে ঋত্বিক এবার মন্দির চত্বরের বিশাল লাইনগুলো দেখতে লাগলো । সাপের মতো এঁকে বেঁকে কতগুলো যে লাইন এসেছে তার ইয়ত্তা নেই । সেই সকাল থেকে না খেয়েই আছে । পেটের মধ্যে ছুঁচোর গুঁতোগুতি অনুভব হচ্ছিলো বেশ অনেক্ষণ ধরে এবার সেটা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১২.৩০ বাজবো বাজবো । ওদিকে সাথীরাও দেখলো সব শিবমন্দির দর্শন করে এগিয়ে আসছে তারই দিকে । মায়ের ইচ্ছা অনুযায়ী সকলে গিয়ে গঙ্গার বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে নেমে মাথায় জল দেয়া হল । তারপর হিংএর কচুরি দিয়ে আপাতত পেটে ছুঁচোর গুতোগুতি বন্ধ করে, ওদের গাড়িতে করেই চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই বাড়িতে ঢুকে গেলো ।
**********************
দৃশ্য_৫ম
দুপুরে মালতিদির হাতে রান্না নিরামিষ খিচুড়ি , আলুর দম, পাঁপড় ভাজা আর চাটনি দিয়ে জমিয়ে ভোজ সারলো সকলেই । সাথীই বুদ্ধি করে এগুলো মেনুতে রেখেছিলো । সাথী এই ক'মাসে শাশুড়িকে ঠিক চিনে নিয়েছে । যতই পুজো বাইরে দিক , সেইদিন মাছ মাংস কিছুতেই নয় । আর এমনিতেই কাল এতো বাইরের খাবার খাওয়া হয়েছে , সত্যি বলতে কি ওরও বাড়ির হালকা খাবার খেতেই ইচ্ছা করছিলো ।
দুপুরে খাবার পর সাথীর শ্বশুর শিবনাথ বাবুর একটু ভাত ঘুম দেবে বলে নিজের ঘরে চলে যায় । এটা ওনার সারা জীবনের অভ্যাস । আজীবন ব্যবসা সামলেছেন এই ভাবেই । চন্দননগরের স্টেশন লাগোয়া একটা ফার্নিচারের দোকান , দুপুরে কর্মচারীদের হাতে ভার দিয়ে বাড়ি চলে আসেন এখনও । দুপুরে ছোট্ট একটা ভাত ঘুম দিয়ে আবার বিকেলে রিক্সা চড়ে পৌঁছে যান দোকান ।
বাকিরা সকলে ড্রয়িং রুমে মুখসুদ্ধি চিবোতে চিবোতে বৈকালিক আড্ডায় বসলো । হ্যাঁ বৈকালিকই বটে । বাড়ি এসে ফ্রেশ হয়ে সকলের খাওয়া শেষ হতে প্রায় ঘড়ির কাঁটা চারটে ছুঁই ছুঁই । সাথীর শাশুড়ি মৃণাল, খুবই শান্ত স্বভাবের , সাত চড়ে রা কাটেনা । আর টিপিক্যাল শাশুড়ি তো কোনমতেই নয় । হৃশিতার মতোই ভালোবাসে সে সাথীকে । সকলে মিলে হৈ হৈ করে বছরের প্রথমদিনটা কেটে গেলো । সাথীর বারংবার অনুরোধ ফেলতে পারেনি মৃণাল । তাই নতুন বছরের শুরুটা ছেলের বাড়ি রাত কাটিয়েই হলো ।
অনেকের কথার মধ্যেই হঠাৎ কানে এলো মায়ের কন্ঠস্বর । সেই পরিচিত দৃশ্য । মুখ বন্ধ অথচ মায়ের গলা শুনতে পেলো ঋত্বিক । সাথীর পাশে বসে ওর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে মা বলছে ---- চাকরি, বেড়ানো, ঋত্বিককে ভালো রাখা সবই তো হচ্ছে , এবার একটা নাতি নাতনীর মুখ দেখে যেতে পারলে হয় । কবে আছি কবে নেই । ওদিকে হৃশিতাও যেমন । দেখতে দেখতে ৬ বছর হলো অথচ দেখো কেউ একটা বাচ্চা নিতে চায়না ।
মায়ের কথাগুলো শুনে ঋত্বিক দেওয়ালে টাঙানো মুখোশের দিকে তাকিয়ে ভাবে দেখাই যাক আর কি কি ঘটনার সাক্ষী হবে ও । তবে এই মুখোশের ব্যাপারটা এক্ষুনি ও সাথী বা অন্য কাউকে বলতে চাইছে না । কেউ জানলেই তার ব্যবহারে পরিবর্তন আসতে বাধ্য । তাই ঋত্বিকও মনে মনে বেশ উত্তেজিত হয়ে আছে আগামী দিনে আর কার কার মুখোশের উন্মোচন হবে ভেবে । কিন্তু কয়েকটা প্রশ্ন তার মনে খচখচ করতেই থাকে ।
ঠিক তখনই কানে এল মনোজিৎদার কন্ঠস্বর ----- কতবার বলেছি হৃশিতাকে , এবার বাবাকে বলো , দোকানটা তোমার নামে লেখাতে । আরে দাদা তো কলকাতার চাকরি ছেড়ে দোকান সামলাতে আসবে না । পাশাপাশি দোকান হবার সুবাদে সেই সর্বঘাটের কাঁঠালি কলা হতে হবে এই জামাইকেই । অথচ সম্পত্তি দেবার বেলার অমনি ছেলে ছেলে । যদিও আমি অমিত বাবুকে হাত করে রেখেছি । দোকানের হিসাবের খাতাটা আমার নির্দেশেই চলে । তবুও ....।
মনোজিৎদার কন্ঠস্বর শুনে ঋত্বিক চমকে উঠেছে । প্রতিটা মানুষের মধ্যে এই মুখ আর মুখোশের খেলা কি চলতেই হবে । এতক্ষন বাইরের লোকের কথা শুনছিল কিন্তু এখন যে নিজের পরিবারের লোকের আসল রূপ খুলছে এই মুখোশ । এই মনোজিৎদা, যাকে দিদি বিয়ে করেছিল বাড়ির অমতে, আর একটু একটু করে বাবার সাহায্যে নিজের দোকান দাঁড় করিয়েছে । আর সেই কিনা সম্পত্তির লোভে দোকানের হিসাবে কারচুপি করছে। সত্যিই মানুষের লোভ কোথায় পৌঁছাতে পারে । মনে মনে ঠিক করে নেয় এর একটা বিহিত করতে হবে ।
ওদিকে মা , হৃশিতা আর সাথী হেসে হেসে কিছু বলছিল । ঠিক তখনই ভেসে এলো হৃশিতার গলা ---- কিছুই বুঝিনা যেন সাথী । সারাক্ষণ শুধু মা মা করে যাচ্ছ ।ভুলে যেও না আমি মেয়ে আর তুমি ছেলের বৌ । মায়ের জড়োয়ার সেটটা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না । ওটা আমার চাই-ই । ওটার ওপর শুধু আমার অধিকার আছে । দাদার বৌ হয়েছে বলে যেন সব কিছুতে আমার সমান সমান অধিকার পেতে হবে সাথীকে । কই আমার কপাল তো এতো ভালো নয় । মনোজিৎ এর মা কোনোদিনও আমাকে মেয়ের জায়গা দিয়েছে । অথচ আমার মাকে দেখো ?
হৃশিতার কথাগুলো যেন নিজের কানে বিশ্বাস করতে পারছিল না ঋত্বিক । তার নিজের বোনের এইরকম মনোবৃত্তি । অথচ সাথীকে তো সে চেনে । কোনোদিনও সে ওই মানসিকতা নিয়ে তার বাবা মায়ের সেবাযত্ন করেনি । কিন্তু হৃশিতা.... ও কিভাবে এধরনের চিন্তা ভাবনা পোষন করে । বাবা মা তো তাদের এই শিক্ষা দেয়নি । তবে দুজনের মধ্যে এই পরিবর্তন কিভাবে ? নিজের বোনের মনের এই দিকটা একেবারেই অজানা ছিল ওর । মনোজিৎদা তো অন্যের ছেলে । কিন্তু হৃশিতার কথায় শতগুণ বেশি কষ্ট পাচ্ছে ঋত্বিক । তবে সব ঘটনার পিছনে কি তাহলে ঐ অরুনাচলের মুখোশটাই কাজ করছে ভেবে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেটার দিকে । তাহলে কি লামা ছেলেটার বলা কথাগুলো সত্যি ?
চলবে ..।।
© কুহেলী_ব্যানার্জী ।।
©All copyright reserved to Kuheli Banerjee.
