সোমায়ণ ঘোষ একজন উদীয়মান কথাসাহিত্যিক, যিনি বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষায় সমান দক্ষতায় লেখালেখি করেন। তাঁর লেখায় রহস্য, মনস্তত্ত্ব, অন্ধকার বাস্তবতা এবং মানবিক আবেগ একসূত্রে গাঁথা থাকে। তিনি বিশেষভাবে পরিচিত তাঁর থ্রিলারধর্মী রচনাশৈলীর জন্য, যেখানে প্রতিটি গল্প ধীরে ধীরে...More
সোমায়ণ ঘোষ একজন উদীয়মান কথাসাহিত্যিক, যিনি বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষায় সমান দক্ষতায় লেখালেখি করেন। তাঁর লেখায় রহস্য, মনস্তত্ত্ব, অন্ধকার বাস্তবতা এবং মানবিক আবেগ একসূত্রে গাঁথা থাকে। তিনি বিশেষভাবে পরিচিত তাঁর থ্রিলারধর্মী রচনাশৈলীর জন্য, যেখানে প্রতিটি গল্প ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়, পাঠককে টেনে নিয়ে যায় এক অনিশ্চিত, তবু গভীরভাবে অনুভূতিময় জগতে।
সোমায়ণের লেখার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—চরিত্রগুলির অন্তর্দ্বন্দ্ব ও মানসিক ভাঙনের সূক্ষ্ম চিত্রায়ণ। তাঁর গল্পে শুধু ঘটনা নয়, মানুষের ভিতরের অন্ধকারও সমান গুরুত্ব পায়। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই একটি অজানা স্তর লুকিয়ে থাকে, যা সঠিক পরিস্থিতিতে প্রকাশ পায়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে মেডিকেল থ্রিলার “অবিচ্ছিন্ন স্পন্দন”, যেখানে সমাজের অন্তর্লীন দুর্নীতি ও সত্যের লড়াই উঠে এসেছে এক ভিন্ন মাত্রায়। এছাড়াও তাঁর অন্যান্য সৃষ্টিতে পারিবারিক সম্পর্ক, অপরাধবোধ, এবং অতীতের ছায়া বারবার ফিরে আসে, যা তাঁর লেখাকে করে তোলে গভীর ও চিন্তনীয়।
পেশাগতভাবে তিনি চিকিৎসক নন, কিন্তু তাঁর লেখায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম দিকগুলিও দক্ষতার সঙ্গে ফুটে ওঠে। একজন লেখক হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন—গল্প শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং সত্যকে প্রশ্ন করার এবং মানুষের ভেতরের অদেখা দিকগুলোকে সামনে আনার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
সোমায়ণ ঘোষের সাহিত্যযাত্রা এখনো প্রারম্ভিক পর্যায়ে হলেও, তাঁর স্বতন্ত্র ভঙ্গি ও বিষয়বস্তুর গভীরতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের এক সম্ভাবনাময় কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
Book Summary
এই গল্পটি সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে রচিত, যেখানে কল্পনার আবরণে ঢাকা হয়েছে এমন বাস্তবতা—যা আজও অনেকের জন্য বলার চেয়ে চুপ থাকাই নিরাপদ।
ভারতের চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়গুলোতে এক ধরনের নীরবতা বাস করে—যা শান্ত নয়, যা পবিত্র নয়। এটি ভয়ের নীরবতা। এটি শেখানো নীরবতা। জীবন বাঁচানোর জন্য তৈরি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেই এই নীরবতা সবচেয়ে বেশি মানুষকে ভেঙে দেয়। এই নীরবতা হোস্টেলের করিডোরে ঘোরে। অল্প আলোয় ঢাকা সিঁড়িতে লুকিয়ে থাকে। হাসপাতালের ওয়ার্ডের কোণে জমে থাকে—যেখানে ক্লান্ত শিক্ষার্থীরা মাথা ঠেকায়, এমন এক শ্বাস নিতে, যা আর ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। সবাই জানে এই নীরবতা কী। আর সবাই শিখে যায়—চুপ থাকতে। কারণ কেউ কথা বললেই, ব্যবস্থা জেগে ওঠে। মহৎ আদর্শের মুখোশের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে এক পচে যাওয়া কাঠামো। এখানে অনিয়ম চাপা পড়ে যায়, অভিযোগ মরে যায় ফাইলের ভেতর, আর তদন্তের আগুন নিভে যায় ক্ষমতার ছায়ায়। রাজনীতি এখানে রক্তের চেয়েও ঘন। স্তরবিন্যাস এখানে অস্ত্র। আর আনুগত্য—সেটাই একমাত্র নিরাপদ মুদ্রা। সততা নয়। সাহস নয়। শুধু আনুগত্য।
তবু… প্রতিটি ব্যাচে একজন থাকে।
একজন, যে ভয় মানে না। একজন ছাত্র, বা ছাত্রী যাকে ভাঙার চেষ্টা করা হয়। একজন রেসিডেন্ট, যাকে চুপ করাতে বলা হয়। একজন তরুণ চিকিৎসক, যাকে বোঝানো হয়—সব হারাতে প্রস্তুত না থাকলে সত্য বলা যায় না। তারা বোঝে। তবু বলে।
তারাই হুইসেলব্লোয়ার—এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ।
কারণ তারা চিৎকার করে না, তারা নথি দেখায়। তারা হিংসা চায় না, তারা জবাব চায়। তারা জানে—চিকিৎসা পেশা পবিত্র হওয়ার কথা ছিল, আর সেই পবিত্রতাকেই সবচেয়ে বেশি রক্তাক্ত করা হয়েছে। তাদের সাহসের কোনো উৎসব হয় না। তাদের লড়াই একা হয়। তাদের জয়—যদি কখনো আসে—তার দাম দিতে হয় নির্ঘুম রাত, ভাঙা বন্ধুত্ব, আর সেই স্থায়ী ভয়ে যে সত্য হয়তো কাউকে বাঁচানোর আগেই তাদের ধ্বংস করবে। বেশিরভাগ মানুষ চোখ নামিয়ে জাবেন ওরা চোখ তোলে। বেশিরভাগ মানুষ ফিসফিস করে। ওরা নাম ধরে বলে। বেশিরভাগ মানুষ নীরবতায় বেঁচে থাকে। ওরা বাঁচে নীরবতা ভেঙে। এই গল্প কোনো ব্যতিক্রম নয়।
এটি একটি লক্ষণের মতো—একটি গভীর অসুখের। কিন্তু অসুখ যেমন ধীরে ধীরে ছড়ায়, প্রতিরোধও তেমনি জন্ম নেয়। ঝড় ভাঙে তখনই, যখন কেউ বাতাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে—এক চুলও না সরে, যদিও চারদিক থেকে তাকে ভেঙে পড়তে বলা হয়। আজও ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে, হোস্টেলে হোস্টেলে, লেকচার হলের ছায়ায়—এমন মানুষ আছে। তারা লড়ে খ্যাতির জন্য নয়, শিরোনামের জন্য নয়, প্রতিশোধের জন্য নয়। তারা লড়ে যেন আর কোনো মেয়ে ভয়ে চুপ করে না থাকে। যেন অভিযোগ মানেই ক্যারিয়ারের সমাধি না হয়। যেন হাসপাতাল একদিন নিজের মানুষকেও রক্ষা করতে শেখে।
সেই দিন না আসা পর্যন্ত, এই যুদ্ধ থামবে না।
আর এই যুদ্ধ লড়বে তারাই— যারা স্বস্তির চেয়ে সত্যকে, নিরাপত্তার চেয়ে সাহসকে, আর নীরবতার চেয়ে ন্যায়কে বেছে নেয়। তারাই পরিবর্তনের স্পন্দন। কখনো ক্ষীণ। কখনো রক্তাক্ত। কিন্তু ভাঙা নয়। যতদিন সেই স্পন্দন চলছে, এই অন্ধকারের ভেতরেও আশা পুরোপুরি মরে যাবেনা।